kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার ২২% নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের  শিকার ২২% নারী

দেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই নির্যাতনের শিকার। জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তারা স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

সম্মানহানির ভয়ে বেশির ভাগ নারী পুলিশ কিংবা জনপ্রতিনিধি কারো কাছে অভিযোগ করতে যায়নি। প্রকারান্তরে তাতে করে দেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বিবিএসের করা জরিপটি গতকাল রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ২২ শতাংশ নারী বলেছে, তাদের স্বামী দেনমোহরের কিছু অংশ পরিশোধ করেছে। ১১ শতাংশ বলেছে, দেনমোহরের অর্থ মাফ করে দিতে অনুরোধ জানিয়েছে তাদের স্বামী। ২৮ শতাংশের অভিযোগ, তাদের স্বামীরা দেনমোহরের এক কানাকড়িও পরিশোধ করেনি। মাত্র ১২ শতাংশ নারী বলেছে যে নগদ টাকা কিংবা অলংকার আকারে তারা স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহরের পুরোটাই পেয়েছে।

রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডাব্লিউ)’ শিরোনামের জরিপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অন্যদের মধ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, ঢাকায় জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা মাতাভেল পিসিন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি পিয়েরে ম্যালডন, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মোজাম্মেল হক বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিএস মহাপরিচালক আবদুল ওয়াজেদ।

জরিপের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিবিএসের পরিচালক জাহিদুল হক সরদার। জরিপ পরিচালনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছরের ১৩ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ২১ হাজার ৬৮৮ জন নারীর সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়। আর জরিপ পরিচালনায় কোনো পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল না। বরিশাল বিভাগের দুই হাজার ৩২০, চট্টগ্রাম বিভাগের তিন হাজার ৪৬৭, ঢাকা বিভাগের পাঁচ হাজার ২১, খুলনা বিভাগের দুই হাজার ৭৬২, রাজশাহী বিভাগের তিন হাজার ২৫, রংপুর বিভাগের দুই হাজার ৭৮৫ এবং সিলেট বিভাগের দুই হাজার ৩০৮ জন নারীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জরিপটি করা হয়েছে। এতে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ইউএনএফপিএ।

জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের নারীরা সবচেয়ে বেশি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। আর সবচেয়ে কম নির্যাতনের শিকার হয় সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের নারীরা। রাজশাহী বিভাগের ৬০ শতাংশ বিবাহিত নারী অভিযোগ করেছে, তারা স্বামীর কাছ থেকে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। খুলনা বিভাগের ৫৭ শতাংশ ও রংপুর বিভাগের ৫৫ শতাংশ নারী একই ধরনের কথা বলেছে।

শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নির্যাতনেও এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ নারী বলেছে যে স্বামীর কাছ থেকে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। রংপুরের ৩৪, খুলনার ৩০, ঢাকার ২৪, চট্টগ্রামের ২৩ ও সিলেটের ২০ শতাংশ নারী একই কথা বলেছে।

জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২২ শতাংশ নারী বলেছে যে তারা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১১ শতাংশ, গাড়ি, সড়ক ও রাস্তায় ১০ শতাংশ নারীকে শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৭৭ শতাংশ নারী বলেছে, স্বামীর বাড়িতে তারা বেশি নির্যাতিত হয়েছে। ১৬ শতাংশ নারী বলেছে তারা নিজের বাবার বাড়িতে নির্যাতিত হয়েছে।

জরিপের বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশে শুধু নারীদের নির্যাতন নিয়েই জরিপ হয়। পুরুষের ওপরও কোনো নির্যাতন হয় কি না তা খতিয়ে দেখতে জরিপ পরিচালনা দরকার। এ ব্যাপারে বিবিএসের প্রতি তাগিদ দেন তিনি। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আগে পুরুষরা একাধিক বিয়ে করতেন ছেলে সন্তানের জন্য। এখন আর সে ধারা নেই। মেয়ে সন্তানেরা এখন লেখাপড়া করছে, চাকরি করছে। আর নারীদের ওপর নির্যাতন বিশ্বের সব দেশেই আছে। ভারতে প্রতি তিন মিনিটে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়। নারী নির্যাতন দূর করা যাবে না, তবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটা কমে আসবে।

নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিবিএসের এই জরিপ অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে দেশে নারী নির্যাতন কমেছে। দেশে ২০১১ সালে নারী নির্যাতনের হার ছিল ৮৭ শতাংশ। এবার তা ৮০ শতাংশে নেমে এসেছে। এটা আরো কমাতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে নারীরা দুর্বল হওয়ায় পুরুষরা নির্যাতন করছে। তবে বর্তমান সরকার নারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করেছে। আশা করা যায় এতে করে নারী নির্যাতন কমে আসবে।

অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা বলেন, নারী নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি কমাতে হলে সবার সচেতনতা জরুরি।


মন্তব্য