kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শারদীয় দুর্গাপূজা

অনন্য মহাভারত

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অনন্য মহাভারত

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির জামালপুরের দুর্গামন্দিরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হচ্ছে ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ। ছবি : কালের কণ্ঠ শারদীয় দুর্গাপূজা

বিশাল জলাশয়। পানির ওপর চারতলাবিশিষ্ট একটা মণ্ডপ।

প্রথম তলায় বিষ্ণুর ১০ অবতার ও ভীষ্মের কাহিনী। দ্বিতীয় তলায় রাজপরীক্ষিত ও নরকের কাহিনী। তৃতীয় তলায় স্বর্গের কাহিনী। চতুর্থ তলায় দেবলোকের কাহিনী—যার মধ্যে থাকবে ভাসমান রথযাত্রা, দোলযাত্রা ও ভাসমান দুটি ফোয়ারা।

‘মহাভারত সম্পর্কে জানুন’—এ স্লোগানকে সামনে রেখে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে এ পূজার আয়োজন চলছে। মহাভারত অবলম্বনে স্বর্গ ও নরকের কাহিনীকে ধারণ করে ২০৫টি দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করা হচ্ছে। প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই ব্যতিক্রমী মণ্ডপ তৈরিতে প্রায় ১০ হাজার বাঁশ, ছয় মণ লোহা ও বিপুল পরিমাণ কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ওই মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরের ভেতর কারিগররা প্রতিমায় রং করছেন। আরেক পাশে বাঁশ দিয়ে বিশাল আকারের মণ্ডপ তৈরি করছেন মিস্ত্রিরা। একপাশে পুকুর। আরেক পাশে নিচু জমি। মণ্ডপ তৈরির পর নিচু অংশও পানি দিয়ে ভরা হবে।

কালুখালী উপজেলা থেকে আসা প্রতিমাশিল্পী দীপক কুমার পাল বলেন, ‘আমরা তিন মাস ধরে এখানে প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। সাতজন কারিগর দিন-রাত পরিশ্রম করছে। ইতিমধ্যে রঙের কাজ প্রায় শেষ। এর পর করা হবে অঙ্গসজ্জা। সংক্ষেপে পুরো মহাভারতের কাহিনী এখানে ফুটিয়ে তোলা হবে। ’

এই কাহিনী সম্পর্কে দীপক কুমার পাল জানান, পিতৃসত্য পালনের জন্য শান্তনুর ছেলে দেবব্রত আজীবন বিয়ে করেননি ও রাজসিংহাসনে বসেননি। এই ভীষণ প্রতিজ্ঞা করায় তাঁকে ভীষ্ম বলা হয়। ভীষ্মের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য রাজত্ব চালান। তাঁর দুই ছেলে, ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ড। বড় ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ায় পাণ্ড রাজা হন। কিন্তু পাণ্ডর অকালমৃত্যুর পর রাজত্ব ধৃতরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে আসে। এখানেই শুরু হয় মহাভারতের মহাবিরোধ। কে রাজা হবেন? পাণ্ডর ছেলে না ধৃতরাষ্ট্রের? শুরু হয় হিংসা ও ষড়যন্ত্র। কাহিনীর পরিণতি ১৮ দিনের এক যুদ্ধে। যাতে ভারতবর্ষের বহু রাজার প্রাণ যায়। মৃত্যু হয় ধৃতরাষ্ট্রের বড় ছেলে দুর্যোধনসহ শত ছেলের। শেষে রাজত্ব পান পাণ্ডর বড় ছেলে যুধিষ্ঠির। পুরো কাহিনীতে শ্রীকৃষ্ণ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এই কাহিনীর আধ্যাত্মিক সারাংশ হলো ধর্মের জয় ও অধর্মের নাশ। এ কাহিনীকে সামনে রেখে এখানে বিষ্ণুর ১০ অবতার, ভীষ্মের কিছু অংশ, যুদ্ধক্ষেত্রের কিছু অংশ, স্বর্গ ও নরকের কিছু কাহিনী, মহাসমুদ্রে নারায়ণ ও কুম্ভের দোল দেখানো হবে।

মণ্ডপ তৈরি করছেন চট্টগ্রাম থেকে আসা প্রধান কারিগর মো. ওসমান আলী। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা টানা দুই মাস ধরে কাজ করছে। বাঁশের এ মণ্ডপটি লম্বা ২০০ ফুট, চওড়া ৪০ ফুট ও উচ্চতা ৫০ ফুট। আগতরা মণ্ডপটির এক পাশ দিয়ে উঠতে পারবে এবং অন্যপাশ দিয়ে নামতে পারবে। এক সঙ্গে এ মণ্ডপে পাঁচ-ছয় হাজার মানুষ উঠতে পারবে। এ কারণে অত্যন্ত মজবুতভাবে মণ্ডপটি তৈরি করা হয়েছে। ’

দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ বিশ্বাস বলেন, ‘এখানে ২০ বছর ধরে দুর্গা পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। চার বছর ধরে বড় পরিসরে আয়োজন চলছে। তবে বিগত সব বছরের রেকর্ড এবার ভাঙা হচ্ছে। মণ্ডপটির আকার ও মূর্তির সংখ্যা এবার বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবছর এখানে চার-পাঁচ লাখ মানুষের আগমন ঘটে। এবার আরো বেশি দর্শনার্থীর আগমন ঘটবে। আগামী ৬ অক্টোবর থেকে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। টানা ১০ দিন এ প্রদর্শন চলবে। তবে সম্প্রতি দেশে জঙ্গিবাদী তত্পড়তার কারণে আমরা কিছুটা চিন্তিত। বিষয়টি পুলিশ ও প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ’

মন্দিরের সভাপতি বিধান কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ‘মানুষকে স্বর্গ ও নরকের পার্থক্য সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া ও নতুন প্রজন্মের কাছে মহাভারতের কাহিনী তুলে ধরতেই আমাদের এ আয়োজন। ’

রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার (এসপি) জিহাদুল কবির বলেন, ‘রাজবাড়ী জেলায় এবার ৩৯৯টি দুর্গা পূজার মণ্ডপ তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি থাকবে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাহারা। তা ছাড়া জামালপুর সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। ’


মন্তব্য