kalerkantho


প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাই শনাক্ত

এস এম আজাদ   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাই শনাক্ত

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ২২ জনকে হত্যার ঘটনায় পরিকল্পনাকারীসহ জড়িত সবাইকেই শনাক্ত করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। পাশাপাশি হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা এবং পরোক্ষভাবে জড়িত আরো দুই ডজন জঙ্গির নামও জানা গেছে। গত তিন মাসে পুলিশের অভিযানে ওই হামলার সঙ্গে জড়িত অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছে। এসব জঙ্গি আইএস মতাদর্শে বিশ্বাসী নব্য জেএমবির সদস্য।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতক জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। তদন্তের এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুলশান হামলার পর বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত ও অভিযান দেশে-বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা দেয় গুলশান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীকে শনাক্ত করা, যে পরে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে মারা যায়। তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই জঙ্গি হামলায় জড়িতদের জীবিত ধরা যাচ্ছে না।

এদিকে এখনো অধরা আছে বেশ কয়েকজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি যারা গুলশানের মতো ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা করে বলে তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ হচ্ছে পুরাতন জেএমবির শুরা সদস্য মাহফুজ সোহেল ওরফে হাতকাটা সোহেল ওরফে নাসিরুদ্দিন ওরফে ভাগিনা সোহেল (এখন নব্য জেএমবিতে); চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নূরুল ইসলাম মারজান, খেলাফত নেতা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালী, তাত্ত্বিক নেতা আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর, উত্তরাঞ্চলের কমান্ডার রাজীব গান্ধী ওরফে রাজীব ওরফে শুভাষ ওরফে জাহাঙ্গীর, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ, অর্থ ও আইটি সমন্বয়ক বাশারুল্লাহ ওরফে বাশারুজ্জামান ওরফে রাহুল ওরফে চকলেট ওরফে শান্ত, ডাকাতির সংগঠক ওয়াসিম আজওয়াদ আব্দুল্লাহ ওরফে আসিফ আজওয়াদ, কমান্ডার মানিক, সংগঠক ইকবাল, মামুন, জুনায়েদ হাসান খান, ইব্রাহিম হাসান খান, প্রশিক্ষক সাকিব ওরফে মাস্টার, মিজান, অপারেশন বাস্তবায়নকারী বাদল, সাগর, আকাশ ও আজাদুল ওরফে কবিরাজ উল্লেখযোগ্য।

জানতে চাইলে সিটিটিসি ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি ঘটনার তদন্তের প্রধান দুটি বিষয় হচ্ছে—কারা করেছে তা শনাক্ত করা এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা। গুলশানের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। তাদের প্রধান অনেকেই পুলিশের অভিযানের সময় মারা গেছে। বাকিদেরও আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি, যাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তাই আমরা বলতে পারি, এই ঘটনার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ’

পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুলশানের ঘটনায় অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাদের ব্যাপারেও তথ্য পাওয়া গেছে। এখনো যারা পলাতক আছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ’ তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থের উৎস, ভারত সীমান্তে অস্ত্রের রুট জানা গেছে। একই সঙ্গে অর্থগ্রহীতা বাশারুল্লাহ ওরফে বাশারুজ্জামান ওরফে রাহুল ওরফে চকলেট ওরফে শান্ত এবং বোমা সরবরাহকারী সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজের নামও পাওয়া গেছে। এভাবে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করা গেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, গুলশান হামলার মূল সংগঠক তামিম চৌধুরী। এই হামলার পর বড় হামলার পরিকল্পনা ছিল নব্য জেএমবির এই সংগঠিত জঙ্গিদের। গত ২৬ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে অভিযানে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ওই অভিযানে নিহত হয় ৯ জঙ্গি। রাকিবুল হাসান রিগ্যান নামের এক জঙ্গিকে জীবিত গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে পরে গুলশান হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ মামলায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এদিকে গত ২৮ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় আরেকটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। ওই অভিযানে নিহত হয় গুলশান হামলার প্রধান সংগঠক তামিম চৌধুরীসহ তিনজন। এরপর রাজধানীর রূপনগরে অভিযানে নব্য জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম এবং সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে অভিযানে মারা যায় সংগঠক তানভীর কাদেরী। তারা দুজনই তামিম চৌধুরীর সহযোগী ও গুলশান হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিল। আজিমপুরের অভিযানে এক কিশোর ও তিন নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়, যারা পরিকল্পনার সহায়তাকারী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জঙ্গিদের ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে নব্য জেএমবির সদস্যদের দেশের বাইরে যোগাযোগ করে হামলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গত, গত ১ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারি ও ওকিচেন রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশি, দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২২ জন নিহত হয়। পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর অপারেশন থান্ডার বোল্ট অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত এবং ১৩ জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরে জিম্মিদের মধ্যে দুজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। এই ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে সিটিটিসি ইউনিট।  


মন্তব্য