kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড

শ্রমিক নিয়োগে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য!

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শ্রমিক নিয়োগে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য!

ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে ২০ জন অস্থায়ী শ্রমিককে স্থায়ী করার অভিযোগ উঠেছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য এসব শ্রমিকের কাছ থেকে কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে।

মেঘনার সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যন্ত অনেকেই এই ঘুষ-বাণিজ্যে জড়িত।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, কর্তাদের চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় চাকরি স্থায়ী হয়নি এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের। আবার টাকা দিয়েও চাকরি স্থায়ী হয়নি এমন অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। চাকরি স্থায়ী হওয়া সবাই জনপ্রতি অন্তত পাঁচ লাখ টাকা করে ঘুষ দিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল্লা আল খালেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঠিকাদারের অধীনে থাকা শ্রমিকদের কম্পানিতে ক্যাজুয়াল শ্রমিক করা হয়েছে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কম্পানির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বিপিসির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন পর কম্পানিতে শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় অস্থায়ী শ্রমিকরাও খুশি হয়েছে। ’

জানা গেছে, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সাইফুল্লা আল খালেদ যোগ দেন গত জুলাই মাসে। এরপর তিনি কম্পানির অস্থায়ী শ্রমিকদের মধ্য থেকে স্থায়ী (জিই-০১ গ্রেড) করার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেন। এ সময় কম্পানির ১৪৭ জন অস্থায়ী শ্রমিক আবেদন করেন। তাঁদের মধ্যে একজন কাজী নাজিম উদ্দিন। তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে চাকরি স্থায়ীকরণের আবেদন করেন। দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে গাড়িচালকের অস্থায়ী পদে কাজ করছেন তিনি। আবেদনকারীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ছিলেন। কিন্তু নিয়োগকর্তাদের টাকার বিনিময়ে খুশি করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তাঁর চাকরি স্থায়ী হয়নি।

মেঘনার একাধিক সূত্র জানায়, স্থায়ী করা ২০ জন শ্রমিকের মধ্যে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে তিনজন, পতেঙ্গায় প্রধান স্থাপনায় (এমআই) সাতজন, ফতুল্লা ডিপোতে দুজন, বরিশাল ডিপোতে একজন, পার্বতীপুর ডিপোতে একজন, দৌলতপুর ডিপোতে তিনজন, বাঘাবাড়ী ডিপোতে একজন, গোদনাইল ডিপোতে একজন ও চাঁদপুর ডিপোতে একজনকে পদায়ন করা হয়েছে।

শ্রমিক স্থায়ীকরণে নানা অনিয়মের উদাহরণ দিয়ে একাধিক শ্রমিক-কর্মচারী জানান, চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনায় পদায়ন করা জয়নাল আবেদীন তাঁর আবেদনপত্রে অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেন সাত বছর। বাস্তবে তিনি মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন মাত্র দুই বছর। তাও শ্রমিক সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে কাজ করছেন। এর আগে ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক হিসেবে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) কার্যকরী সভাপতি হামিদুর রহমানের সহযোগিতায় মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে চাকরি স্থায়ী করেছেন তিনি।

অভিযোগ উঠেছে, পতেঙ্গায় মেঘনার প্রধান স্থাপনায় নিয়োগ পাওয়া আবদুল মান্নান, শাহ নূর ও আলী ওসমান তাঁদের আবেদনপত্রে বয়স কম দেখিয়েছেন। এই তিনজনের বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে হলেও সিবিএ সাধারণ সম্পাদকের যোগসাজশে ঘুষের বিনিময়ে তাঁদের চাকরি স্থায়ী হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রমিকদের অনেকেই জানান, চাকরি স্থায়ী হওয়া ২০ জনের মধ্যে ছয়জনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন সিবিএর সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া অস্থায়ী অনেক শ্রমিকের কাছ থেকে টাকা নিয়েও চাকরি স্থায়ী করাতে পারেননি তিনি। পরে কেউ কেউ সিবিএর সভাপতির কাছে নালিশও করেছেন। তাঁদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন বর্তমানে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন নগরীর পতেঙ্গা ডিপোতে। তাঁর কাছ থেকে সিবিএর সাধারণ সম্পাদক তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন চাকরি স্থায়ী করে দেবেন বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিও স্থায়ী হয়নি, টাকাও ফেরত পাননি। এ বিষয়টি এখন মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে সিনিয়র কর্মকর্তা পর্যন্ত সবার মুখে মুখে।

এ বিষয়ে মেঘনার সিবিএ সাধারণ সম্পাদক সাদিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নিয়োগ কমিটির কেউ নই। আমি কেন কারো কাছ থেকে টাকা নিতে যাব? অনেকের চাকরি হয়নি, তাই তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ’

সিবিএ নেতাদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি নাছির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু কিছু অভিযোগের সত্যতা রয়েছে। ’

অভিযোগ রয়েছে, দৌলতপুর ডিপোতে নিয়োগ পাওয়া আনিসুর রহমান মেঘনা পেট্রোলিয়ামে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কোনো দিন কাজ করেননি। তবে আবেদনপত্রে অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেন সাত বছরের। মূলত তিনি ছিলেন মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল্লা আল খালেদের গৃহকর্মী। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিশেষ সুপারিশে যোগ্যতা ছাড়াই তাঁকে স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য