kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নরসিংদীর শিবপুর

জেঁকে বসেছে জোঁক

সুমন বর্মণ, নরসিংদী   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জেঁকে বসেছে জোঁক

নরসিংদীর শিবপুরে এক মাস ধরে দেখা দিয়েছে জোঁকের উপদ্রব। ছবি : কালের কণ্ঠ

ফসলের মাঠ, সবজি কিংবা ফলের বাগানে জেঁকে বসেছে রক্তচোষা জোঁক। আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ।

রেহাই পাচ্ছে না গবাদি পশুও। ফলে জমিচাষ, ফসল তোলা এখন চাষিদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোঁক বাড়িঘরে ঢুকে পড়ায় আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে অনেকেই।

ভয়াবহ এই ছবি নরসিংদীর শিবপুরের যোশর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের। জোঁকের উপদ্রবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কৃষিপ্রধান গ্রামগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাপন। জোঁকের প্রকৃতি দেখে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি দেশীয় নয়, বিদেশি; পাথর বা কয়লার মাধ্যমে দেশে এসেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যোশর ইউনিয়নে সবজির পাশাপাশি পেয়ারা ও লটকন চাষ করা হয়। আগে বর্ষাকালে ফসলের জমি, ঝোঁপঝাড়ে কদাচিৎ জোঁকের দেখা মিলত। কিন্তু এ বছরের চিত্র ভিন্ন। এক মাস ধরে হঠাৎ করেই এ ইউনিয়নের যোশর, পুরাতন আটাশিয়া, শরীফপুর, সৈকারচর, কাজিয়ারা, শ্রীরামপুর, লেটাব, লালখারটেক, কামারটেক, চৈতন্য ও দেবালয়েরটেক গ্রামের ক্ষেতে, সবজি-ফলের বাগানে জোঁকের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

ঘটনা কতটা ভয়াবহ তা বোঝা যায়, সৈকারচর গ্রামের গৃহবধূ রিনা আক্তারের ভাষ্যে। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর বর্ষায় এক-দুটি জোঁক দেখা যেত। কিন্তু এবার ফসলের জমি থেকে শুরু করে বাড়ির আঙিনা—সবখানে ঝাঁকে ঝাঁকে জোঁক। বৃষ্টি হলে জোঁকের সংখ্যা বেড়ে যায়। অবস্থা এমন যে জোঁক ঘরের ভেতর ও টয়লেটে ঢুকে যায়, গরু-ছাগলকে ধরে, মানুষকে ধরে। জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে বাড়ির চারপাশে ১০ কেজি লবণ ছিটিয়েছি। কিন্তু এভাবে কয় দিন?’

গৃহবধূর এ কথার প্রমাণ মেলে বাড়ির আঙিনার সবুজ ঘাসে ও পাশের পেয়ারা বাগানে গিয়ে। মনে হলো রক্তের গন্ধ পেয়ে জোঁক মাথা উঁচিয়ে মানুষ খুঁজছে! কয়েকটি গরুর নাক ও গোড়ালিতেও দেখা গেল জোঁক। সংবাদকর্মীদের খবর পেয়ে জমি থেকে কচুপাতায় কিছু জোঁক নিয়ে আসেন গ্রামের কৃষাণী সেতারা বেগম। বলেন, ‘আমরা ক্ষেতে-খামারে কাজ করতে গেলে জোঁকে হাতে-পায়ে হুমানে ধরে। ক্ষেতে গরু-ছাগলকে ঘাস খেতে দিলে নাকে-মুখে জোঁক ধরে। পোলাপাইন খেলতে গেলে জোঁক ধরে। শরীর থেকে রক্ত খাইয়্যা পড়ে। আমরা দেখলে লবণ দিয়ে ফালাই। ’

পাশের পুরাতন আটাশিয়া গ্রামের কৃষক কিরণ মিয়া বলেন, ‘জোঁকের ভয়ে ১৫ দিন ধরে মাঠে গরু দেই না। জমিতেও কাজ করতে পারছি না। গরুর জন্য নিজে ঘাস কাটতে এসেছিলাম, এরই মধ্যে তিনটি জোঁকে আমাকে ধরে ফেলেছে। জোঁকের কারণে আমাদের ও গরু-ছাগলের খুব কষ্ট হচ্ছে। ’

কামারটেক গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইয়াছিন মোল্লা বলেন, ‘একদিন রাতে ঘরে জোঁক ঢুকে পড়ে। তা দেখে বাড়ির সবার মনে ভয় ঢুকে যায়। এ কারণে ঘরে লবণ ছিটিয়ে খাটে বসে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। ’

যোশর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এই ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে জোঁকের আক্রমণ ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। জোঁক থেকে যোশরবাসীকে কিভাবে রক্ষা করা যায় তা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার সময় এসেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখনই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। নাহলে ভবিষ্যতে এটা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জোঁক সাধারণত বিলে, জলমগ্ন ক্ষেতে, নদী, পুকুর ও জলস্রোতের আশপাশে আর্দ্র ও ছায়াময় স্থানে থাকতে পছন্দ করে। বর্ষাকালে জোঁকের উপদ্রব বাড়ে। জোঁক মাটি ছাড়াও গাছে, গাছের ডালে-পাতায় থাকতে পারে। যোশরের জোঁকগুলো লম্বায় প্রায় দুই সেন্টিমিটার। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক লতাফত হোসেন বলেন, ‘আমার ধারণা এটি দেশীয় নয়। পাথর কিংবা কয়লার মাধ্যমে বিদেশি এই বালাই দেশে প্রবেশ করেছে। জমিতে কাজ করতে গিয়ে জোঁকের আক্রমণের শিকার হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিসের জন্য এটার উৎপত্তি হয়েছে এবং কিভাবে এটা দমন করা যায় তা খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা প্রয়োজন।


মন্তব্য