kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পূর্বাঞ্চল রেলে ২০৬ গেটকিপার নিয়োগ নিয়ে টানাপড়েন

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পূর্বাঞ্চল রেলে ২০৬ গেটকিপার নিয়োগ নিয়ে টানাপড়েন

পূর্বাঞ্চল রেলে ২০৬ জন গেটকিপার নিয়োগ নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। রেল ভবন চাচ্ছে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ দিতে।

কিন্তু পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে বলছে, রেল ভবনের এই নির্দেশনা মানতে গেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটবে। তারা চাচ্ছে সময় স্বল্পতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অস্থায়ীভাবে কর্মরতদের কাজের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়াতে। বিষয়টি তুলে ধরে গত সোমবার রেলওয়ের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক।

জানা যায়, তিন মাস ধরে চিঠি চালাচালির পরও ২০৬ জন গেটকিপার নিয়োগের বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় বিপাকে পড়েছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে। আগামী এক মাসের মধ্যে স্থায়ী বা অস্থায়ী ভিত্তিতে গেটকিপার নিয়োগ করা না হলে রেল পরিচালনায় মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে। কেননা অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত ২০৬ জন গেটকিপারের কাজের মেয়াদ আগামী ৩১ অক্টোবর শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দুই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গেটকিপার নিয়োগ সম্পন্ন করতে গত ২০ জুন রেল ভবন থেকে চিঠি দেওয়া হয় পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষকে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ-৫ অধিশাখার সচিব ড. মোহাম্মদ তারেক স্বাক্ষরিত আউটসোর্সিং সংক্রান্ত নীতিমালার ৩-এর খ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘যে সমস্ত পদ আউটসোর্সিংয়ের জন্য চিহ্নিত হবে সে সকল পদে স্থায়ী ও অস্থায়ী বা সাময়িক কোনরূপ নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ’

রেলের কর্মকর্তারা জানান, রেলে গেটকিপারের পদটি স্থায়ী। এই স্থায়ী পদ থেকে রেল পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ পয়েন্টসম্যান নিয়োগ করা হয়। অস্থায়ী গেটকিপার থেকে পয়েন্টসম্যান পদে যাওয়ার সুযোগ নেই। আর গেটকিপারের পদটি স্থায়ী হওয়ায় এই পদে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগের নিয়ম নেই। ১০ বছর ধরে গেটকিপার পদে স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ায় পয়েন্টসম্যানের শূন্য পদ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে পয়েন্টসম্যানের প্রায় ২০০টি পদ শূন্য।

বর্তমানে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন রেলপথগুলোতে প্রায় ৬০০ গেট রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই পরিচালনা করছে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ। অন্যগুলো প্রকৌশল বিভাগের অধীনে। রেলস্টেশন ও এর কাছাকাছি গেটগুলো পরিবহন বিভাগের আওতাধীন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এক মাসের মধ্যে স্থায়ীভাবে ২০৬ জন গেটকিপার নিয়োগ করা সম্ভব নয়। এই সময়ের মধ্যে পরিবহন বিভাগে অস্থায়ীভাবে এই পদে নিয়োগ না হলে গেটগুলো উন্মুক্ত হয়ে যাবে। অরক্ষিত হয়ে পড়া এসব গেটে যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হবে।

এ ব্যাপারে জানতে রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন ও পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আবদুল হাইয়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁরা ফোন ধরেননি।

পূর্বাঞ্চল রেলের ঢাকা বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গেটকিপার পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে নতুন করে নিয়োগ হয়নি। এমনকি আদৌ অস্থায়ীভাবে গেটকিপার নিয়োগ হবে সে ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। ’

একই বিষয়ে জানতে একই অঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফিরোজ ইফতেখারকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন ট্রলিতে। কথা বলতে পারছি না। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলের ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ট্রাফিক গেটগুলোর জন্য স্থায়ী মঞ্জুরীকৃত গেটকিপার (চতুর্থ শ্রেণি) পদের সংখ্যা ২৪২টি। বাংলাদেশ রেলওয়ের নন-গেজেটেড সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮৫ মোতাবেক স্থায়ী গেটকিপারের চাকরি তিন বছর পূর্তির পর পয়েন্টসম্যান (তৃতীয় শ্রেণি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরই মধ্যে দুই বিভাগে পদোন্নতি নিয়ে ও অবসরে চলে গেছেন অনেকেই। বর্তমানে মাত্র ৩১ জন স্থায়ী গেটকিপার কর্মরত।

২০০৬ সাল থেকে পূর্বাঞ্চল রেলের বিভিন্ন সময়ে রেলপথের গেটগুলো পরিচালনায় দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে অস্থায়ীভাবে গেটকিপার নিয়োগ করা হচ্ছে। ২১১টি শূন্য পদের বিপরীতে ২০৬টি পদে অস্থায়ী গেটকিপার পদায়নের মাধ্যমে গেটগুলোর অপারেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রথমে এক বছর করে, সর্বশেষ প্রায় দুই বছর ধরে প্রতিবার ছয় মাস মেয়াদে অস্থায়ী গেটকিপার নিয়োগ করা হচ্ছে। সর্বশেষ নিয়োগ করা ২০৬ জন গেটকিপারের মেয়াদ গত ২০ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সময় বাড়িয়ে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এ অবস্থায় রেল ভবন থেকে এক আদেশ জারি করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গেটকিপার নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

রেল ভবন সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল হাই স্বাক্ষরিত একটি চিঠি রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এত অল্প সময়ের মধ্যে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গেটকিপার নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গেটকিপার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় (বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) ও অর্থ বিভাগের যৌথ সম্মতি এবং অর্থ বিভাগ কর্তৃক সরকারি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ-৫ অধিশাখা কর্তৃক জারিকৃত আউটসোর্সিং সংক্রান্ত নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৩-এর খ ও গ, অনুচ্ছেদ ৪ এবং অনুচ্ছেদ ৭-এর ক, খ, গ ও ঘ-তে উল্লেখ আছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গেটকিপার নিয়োগ করা হলে পয়েন্টসম্যান এভিনিউ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে অপারেটিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লোকবলের চরম সংকট দেখা দেবে।

চিঠিতে মহাপরিচালকের উদ্দেশে আরো বলা হয়, ‘উল্লিখিত জটিলতা এড়ানোর লক্ষ্যে অপারেটিং লোকবলের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রেখে শূন্য পদে স্থায়ী গেটকিপার নিয়োগ করার বিষয়ে আপনার পক্ষ হতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং স্থায়ীভাবে নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ট্রাফিক গেটসমূহ সুরক্ষিত রেখে নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিতকল্পে জরুরি ভিত্তিতে বর্তমানে অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত ২০৬ জন গেটকিপারের কার্য মেয়াদ আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। ’


মন্তব্য