kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া

‘এ তো শুধু সম্ভব হক ভাইয়ের পক্ষেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর লেখনীর জাদুতে মুগ্ধ ছিলেন পাঠক, ভক্ত ও অনুরাগীরা। ছোটগল্প, কবিতা, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, শিশুসাহিত্য, নাটক, অনুবাদ, চলচ্চিত্র, সংগীত, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের সব শাখায় সমানভাবে অবদান রাখার জন্য সর্বমহলে সৈয়দ শামসুল হকের পরিচিতি ছিল ‘সব্যসাচী’ হিসেবে।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত এ লেখকের প্রতি গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে ছুটে আসেন বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা।

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে কদিন আগেও ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় নিয়ে আমরা কথা বললাম। কত কথা বললেন। তিনি বলতেন, নিজ শিকড় কুড়িগ্রামে খুব বেশি যাওয়া পড়ে না। সেখানে যেতে তাঁর মন টানত। এখন সেখানেই চিরঘুমে থাকবেন তিনি। ’

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর পর কৈশোরের বন্ধু সৈয়দ হককে স্মরণ করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, মৃত্যুর চার-পাঁচ দিন আগেও টেলিফোনে কথা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। বিশ্বাস করি, তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে সাহিত্যিক। মেধা ও মননের মধ্য দিয়ে অসাধারণ সাহিত্য নির্মাণ করেছেন। তাঁর সাহিত্য পরিমাণে যেমন বড়, গুণেও সমৃদ্ধ।

নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান বলেন, শিল্পীর মৃত্যু হয়, কিন্তু শিল্পের কি মৃত্যু হয়? মৃত্যুশয্যায় বসে তিনি শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ অনুবাদ করছিলেন। এ তো শুধু হক ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘বাংলা কাব্যসাহিত্যে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, আমার মনে হয় তার আশপাশে কেউ নেই। বাংলা ও বাঙালির অধিকার আদায় আন্দোলনের কথা তাঁর লেখায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর রচনা আমাদের অমূল্য সম্পদ। ’

লেখক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সৈয়দ শামসুল হক একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক আলোকিত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে দেশের গণতন্ত্র আর সমাজব্যবস্থার কথা।

‘নুরলদীনের সারাজীবন’ কাব্যনাটক নিয়ে কথা বললেন নাট্য ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। তিনি বলেন, জাতির প্রয়োজনে জাতির সামনে তিনি হাজির করেছিলেন নুরলদীন চরিত্রটিকে। সেই চরিত্রটি জাতিকে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহের শক্তি জুগিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, সাহিত্যের নানা শাখায় তিনি যে অবদান রেখেছেন, বাঙালি জাতি তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার দেখায় সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন পরিপূর্ণ এক বাঙালি, পরিপূর্ণ এক মানুষ, পরিপূর্ণ এক সাহিত্যিক। তিনি বলেন, সৈয়দ শামসুল হক হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাস নিজের কবিতায় বিবৃত করে গেছেন।

সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত বলেন, সৈয়দ শামসুল হক যে ভাষা নির্মাণ করেছেন তা এখনকার আধুনিকতাবোধ, বুদ্ধি এবং শৈলীতে অনন্য। তিনি শেকসপিয়ারকে যে অনুবাদ করেছেন, তা দুই বাংলায় সমানভাবে সমাদৃত।

জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, “‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নুরলদীনের সারাজীবন’-এর চিত্রনাট্য দুটি তিনি জাদুঘরে দেবেন বলেছিলেন। আমরা ভাবছিলাম সৈয়দ শামসুল হকসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লেখককে নিয়ে জাদুঘরে একটি সাহিত্য কর্নার করব। কিন্তু এর আগেই তো তিনি চলে গেলেন। আমরা অবশ্যই তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেব। ”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘একজন সাধারণ পাঠক, দর্শক হিসেবে আমি সৈয়দ শামসুল হককে দেখি আমার প্রিয় লেখক হিসেবে। স্বতন্ত্র ধারার সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন অনেক উঁচুতে। ’


মন্তব্য