kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার নম্বর পুনর্বণ্টন

সৃজনশীলে প্রশ্ন বাড়ায় শিক্ষার্থীরা দুশ্চিন্তায়

শরীফুল আলম সুমন   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সৃজনশীলে প্রশ্ন বাড়ায় শিক্ষার্থীরা দুশ্চিন্তায়

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নম্বর পুনর্বণ্টনে মাল্টিপল চয়েজ কোশ্চেন (এমসিকিউ) বা বহু নির্বাচনী প্রশ্ন থেকে ১০ নম্বর কমিয়ে তা সৃজনশীল প্রশ্নে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে সৃজনশীল অংশে আরো একটি বেশি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে শিক্ষার্থীদের।

নম্বর পুনর্বণ্টনের পাশাপাশি সময়ও পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। এমসিকিউ অংশের জন্য বরাদ্দ সময় থেকে ১০ মিনিট কমিয়ে সৃজনশীল অংশের জন্য সমপরিমাণ সময় বাড়ানো হয়েছে। এতে দুশ্চিন্তা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারা মনে করছে, সৃজনশীল অংশের বাড়তি প্রশ্নের জন্য যেটুকু সময় বাড়ানো হয়েছে তা অপ্রতুল। এ কারণে নম্বর পুনর্বণ্টনের ঘোষণা দেওয়ার পরই রাজপথে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। সৃজনশীল অংশ থেকে একটি প্রশ্ন কমানোর দাবিতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব স্থানেই শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে।

আগামী অক্টোবর মাস থেকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের এসএসসি ও সমমানের টেস্ট (নির্বাচনী) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষার্থীরা দেড় বছর ধরে পুরনো নিয়মেই পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এমনকি প্রিটেস্ট (প্রাক নির্বাচনী) ও অন্যান্য পরীক্ষাও তারা আগের নিয়মে দিয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই বাড়তি ১০ মিনিটের মধ্যে একটি সৃজনশীল প্রশ্নের বেশি উত্তর দেওয়ার নিয়ম ঘোষণায় সন্দিহান হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, শিক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এমসিকিউ অংশের নম্বর কমিয়ে সৃজনশীল অংশে বাড়ানোটাই যৌক্তিক। নম্বর পুনর্বণ্টনের পাশাপাশি সময় যেভাবে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে তাতে শিক্ষার্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে শিক্ষাবিদদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, পুনর্বণ্টনের ঘোষণাটি আরো আগে দিলে ভালো হতো। কোনো কোনো শিক্ষার্থীরও একই মত।

রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদমান জামান বলেছে, ‘এরই মধ্যে আমাদের দেড় বছরের প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেছে। এখন বলা হচ্ছে সৃজনশীলে একটি প্রশ্নের উত্তর বেশি দিতে হবে। সময় বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১০ মিনিট। হঠাৎ করেই আমরা কিভাবে এই প্র্যাকটিস করব। যদি নবম শ্রেণিতে ওঠার পরই এই নতুন নম্বর বণ্টন জানিয়ে দেওয়া হতো তাহলে আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিতাম। কোনো সমস্যা হতো না। ’

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন, ‘এমসিকিউ বরাবরই শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার জায়গাটাকে সংকুচিত করছে। তাই এমসিকিউয়ের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত। আবার ২০১০ সালের পর এই সৃজনশীলের জন্যও নানা সংকট হচ্ছে, ফলে নম্বর পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে। কিন্তু এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার মধ্যে পড়ছে। সিদ্ধান্ত নিতে হলে সেটা পড়াতে পড়াতে মাঝপথে কেন? শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে তখনই সেটা ইমপ্লিমেন্ট করা উচিত ছিল। ’

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাবকমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা না বুঝেই আন্দোলন করছে। আগে ৪০টি এমসিকিউয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪০ মিনিট। এখন ৩০টি এমসিকিউয়ের জন্য বরাদ্দ ৩০ মিনিট। ফলে সৃজনশীলে ১০ মিনিট সময় এখান থেকে বেড়েছে। আগে পরীক্ষার সময়ের মধ্যেই ওএমআর (অপটিক্যাল মার্ক রিডার) ফরম পূরণ করতে হতো। এখন পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট আগেই দুই অংশের ওএমআর ফরম দেওয়া হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের আরো ১০ মিনিট সাশ্রয় হবে। এতে মোট ২০ মিনিট বেশি সময় পাবে। আগে এমসিকিউয়ের উত্তর জেনে বৃত্ত ভরাটের জন্য শিক্ষার্থীরা বসে থাকত। এখন এমসিকিউয়ে সময় কমে যাওয়ায় বসে থাকার সময় পাবে না। আর আসন্ন টেস্ট পরীক্ষায়ও স্কুল-কলেজগুলোকে পুনর্বণ্টন অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা পুরো ব্যাপারটি আয়ত্ত করতে পারবে। ’

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিলের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, ‘আগেও দুই অংশ মিলিয়ে তিন ঘণ্টা সময় ছিল, এখনো থাকছে। এখন সৃজনশীলে একটা প্রশ্ন বাড়িয়ে সময়ও সামান্য বাড়ানো হলেও এটা কোনো সমস্যা হবে না। আমার মনে হয় প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে এ সময়ের মধ্যেই সব উত্তর সুন্দরভাবে লেখা সম্ভব। তবে শিক্ষার্থীদের এ ব্যাপারে প্রস্তুতির দরকার আছে। আমরা শিক্ষার্থীদের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝাচ্ছি। টেস্ট পরীক্ষায়ও নতুন নম্বর বণ্টন অনুযায়ী নেওয়া হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। ’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এত দিন প্রথমে সৃজনশীল ও পরে এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া হতো। এতে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা সকাল বেলা দুই ধরনের প্রশ্ন পেয়ে যাওয়ায় এমসিকিউ অংশ সমাধান করে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দিতেন। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে এমসিকিউ অংশে শতভাগ নম্বর পেয়ে যেত। প্রশ্নপত্রের এ ধরনের ‘ফাঁস হওয়া’ থেকে রক্ষা পেতে চলতি বছর থেকে আগে এমসিসিউ ও পরে সৃজনশীল অংশের পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু এতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। শিক্ষকরা পরীক্ষা শুরু হওয়ার এক থেকে দেড় ঘণ্টা আগে প্রশ্ন পেয়ে তা সমাধান করে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেন। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চিন্তায় পড়ে যায়। এ অবস্থায় চলতি বছর শিক্ষাবিদদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষাবিদরা পর্যায়ক্রমে এমসিকিউ তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। এরই অংশ হিসেবে নম্বর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আগেই অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে শিক্ষা বোর্ডগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বণ্টনের ঘোষণা দিয়েছে গত সপ্তাহে।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে এমসিকিউয়ে কমছে ১০ নম্বর। আর সেই ১০ নম্বর বাড়ছে সৃজনশীল অংশে। যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক আছে এখন থেকে সেসব বিষয়ে ৫০ নম্বর থাকবে সৃজনশীলে, ২৫ নম্বর এমসিকিউয়ে এবং ২৫ নম্বর থাকবে ব্যবহারিকে। আগে এমসিকিউয়ে ৩৫ এবং সৃজনশীলে ৪০ নম্বর ছিল। আর যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক নেই সেসব বিষয়ে সৃজনশীলে থাকবে ৭০ নম্বর এবং এমসিকিউয়ে থাকবে ৩০ নম্বর। আগে সৃজনশীলে ছিল ৬০ নম্বর, এমসিকিউয়ে ৪০ নম্বর। তবে এসএসসিতে ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চারু ও কারুকলাসহ কয়েকটি বিষয় এবং এইচএসসিতে বাংলা দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, চারু ও কারুকলাসহ কয়েকটি বিষয়ে নম্বর বণ্টন অপরিবর্তিত থাকবে। এ ছাড়া এমসিকিউয়ে ৩০ নম্বরের জন্য ৩০ মিনিট এবং ২৫ নম্বরের জন্য ২৫ মিনিট বরাদ্দ থাকবে। সৃজনশীল অংশের জন্য বরাদ্দ থাকবে আড়াই ঘণ্টা। দুই পরীক্ষার মাঝে কোনো বিরতি থাকবে না।


মন্তব্য