kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খবর পেয়ে সবাই ছুটে আসে হাসপাতালে

ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল যকৃত ও হাড়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



খবর পেয়ে সবাই ছুটে আসে হাসপাতালে

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর সংবাদে গতকাল রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ছুটে আসেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কেউ কাঁদছে, কেউ আনমনে পায়চারি, কেউ বা নীরবে এক কোণে দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ গণমাধ্যমের কাছে স্মৃতিচারণা করছে।

তারা সবাই দেশের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। আছে রাজনীতি কিংবা সামাজিক ঘরানার মানুষও। শোকে-আবেগে বিমর্ষ একেকজন। সবাই হারিয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের এক আপনজনকে, অভিভাবককে, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে। গতকাল মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ছুটে আসে শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতিসহ সব অঙ্গনের মানুষ। তারা স্মৃতিচারণা করে। কেউ বলে শুরুর কথা, কেউ বা শোনায় শেষ দিনগুলোতে তাঁর সান্নিধ্যের স্মৃতিকথা। জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে রচিত গানই হয়তো হয়ে থাকছে সব্যসাচী লেখকের প্রকাশিত শেষ সৃষ্টি। তিনি আরো লিখতে চেয়েছিলেন। নাটকে কাজ করার ইচ্ছাও জানিয়েছিলেন শেষবেলায়। আরো কিছু নতুন পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছিলেন বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য নিয়ে।

গণমাধ্যমের সামনেই সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, সৈয়দ শামসুল হক হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও বলেছিলেন, ‘আমি আরো লিখতে চাই। ’

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী খান লাকী বলেন, শেষবেলায় বিছানায় শুয়েও তিনি নাটকের কাজ করে গেছেন। শিল্পকলা এডাডেমির জন্য ‘হ্যামলেট’ নাটকের নতুন নাট্যরূপ দিয়েছেন। আর এবারে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে একটি গানও রচনা করলেন। সম্ভবত এটাই তাঁর শেষ সৃষ্টি হয়ে থাকছে।

নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ দিয়েই তাঁর নাটকে কাজ শুরু। শেষবেলায়ও তিনি নাটক নিয়ে আরো কাজ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টি সীমাহীন। মাত্র ১০ দিন আগেও তিনি শুনিয়েছিলেন নাটক-শিল্প-সাহিত্য নিয়ে অনেক নতুন নতুন পরিকল্পনার কথা।

আরেক নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হকের মতো নাট্যকার আর কোথায় পাব। তিনিই বাংলাদেশে বাংলা নাটকে নতুন প্রাণ জাগিয়ে তুলেছিলেন। ’

চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, ‘আমাদের মাথার ওপর থেকে ছায়াটা সরে গেল। তিনি চ্যানেল আইয়ের শুরু থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমাদের ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন অভিভাবক হয়ে। ’

নাট্যব্যক্তিত্ব তারিক আনাম খান বলেন, ‘আজ বড় কষ্ট হচ্ছে। আমি তাঁর নাটকে কাজ করতে পেরে ধন্য হয়েছি। তিনি আমার বিয়ের সাক্ষী ছিলেন। অনেক স্মৃতি আছে তাঁর সঙ্গে। ’

সুরকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘সৈয়দ হক চলে যাওয়ায় আমাদের যে কী ক্ষতি হলো তা বলে বোঝানো যাবে না। ’

ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক বলেন, সৈয়দ শামসুল হক চলে গেলেন। আজ একটি দিনে অনেক যুগের পরিসমাপ্তি ঘটল।

সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আযম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী মাহাবুবুল হক শাকিল হাসপাতালে ছুটে আসেন।

ইউনাইটেড হাসপাতাল সূত্র জানায়, সৈয়দ শামসুল হক গত ১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টায়  ইউনাইটেড হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্সে ইমার্জেন্সি বিভাগে আসেন। তিনি ১৫ এপ্রিল ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ে (বাঁ ফুসফুসে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা)। লন্ডনে তাঁকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১৯৬৪ সালে তাঁর যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়ার এবং ১৯৮৮ সালে হার্টের বাইপাস সার্জারির ইতিহাস রয়েছে। তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসে ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্যান্সার কেয়ার সেন্টারের কনসালট্যান্ট ডা. অসীম কুমার সেন গুপ্তের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সৈয়দ শামসুল হক ফুসফুসের ক্যান্সারের ফোর্থ স্টেজে এ হাসপাতালে ভর্তি হন। পিইটি পরীক্ষা করে জানা যায়, তাঁর শরীরের অনেক জায়গায় ক্যান্সার ছড়িয়ে গেছে বিশেষ করে যকৃত ও হাড়ে।

ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক (মিডিয়া) ডা. শাগুফা আনোয়ার জানান, সোমবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যার জন্য দুপুর ১২টার দিকে আইসিইউয়ে নেওয়া হয়। ভোর ৪টার পর থেকে তাঁকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ভেন্টিলেটরের সহায়তায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিকেল ৫টা ২৬ মিনিটে তাঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় এবং সব চেষ্টা বিফল করে দিয়ে তিনি মারা যান।


মন্তব্য