kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কুড়িগ্রামবাসীর জন্য সৈয়দ হকের শেষ চিঠি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কুড়িগ্রামবাসীর জন্য সৈয়দ হকের শেষ চিঠি

১. যৌবনকালে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক - ছবি : কালের কণ্ঠ, বিবিসি বাংলা ও সংগৃহীত

গত ১১ মার্চ কুড়িগ্রামবাসীর জন্য একটা চিঠি লিখেছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। ওই চিঠিতে কলেজের উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন।

তিনি লিখেছিলেন, আমার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে আপনারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, এতে আমি আনন্দিত এবং আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জন্মস্থান আমার শেষ ঘর হবে। এটা যে আমার বহু দিনের ইচ্ছা এবং আমার পরিবার-পরিজন সেভাবে প্রস্তুত। তারাও আপনাদের সিদ্ধান্তে আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। আমার সশ্রদ্ধ সালাম রইল।

সৈয়দ শামসুল হক

১১ মার্চ ২০১৬ খ্রি.

 

দেশবরেণ্য লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে তাঁর জন্মস্থান কুড়িগ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয় বাদশাহকে একনজর দেখবে। মৃত্যুর আগে সৈয়দ হকের ইচ্ছা অনুযায়ী কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠের পাশে কবরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নিচু এবং ধানক্ষেত হওয়ায় গতকাল রাতে সেখানে পৌরসভার উদ্যোগে বালু ফেলার কাজ চলছিল।

 

২. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ সৈয়দ হককে হাসপাতালে দেখতে যান

 

জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জানান, সন্ধ্যার পর পৌর মেয়র আব্দুল জলিলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাটি দিয়ে তিন শতক পরিমাণ ধানক্ষেত ভরাট করার জন্য। এরপর সেখানে কবর খুঁড়ে প্রস্তুত রাখা হবে।

এদিকে সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর খবরে কুড়িগ্রামে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ রাশেদুজ্জামান বাবু বলেন, ‘তাঁর মৃত্যুতে আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ’

কুড়িগ্রাম তরুণ লেখক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব নীলু বলেন, ‘তাঁর দীর্ঘ লেখক জীবনে তিনি নানাভাবে মাতৃভূমির ভাষা, কৃষ্টি ও মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর শেষ বেলাতেও তিনি জন্মস্থানের কথা ভুলে যাননি। ’

 

৩. সৈয়দ হকের সঙ্গে প্রকাশক মফিদুল হক ও প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী

 

কুড়িগ্রাম সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক শ্যামল ভৌমিক বলেন, ‘তিনি ছিলেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠস্বর। তাঁর লেখনীতে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ’

এ ছাড়া অন্যান্য প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সন্ধ্যা ৭টায় কালেক্টরেট সম্মেলন কক্ষে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সাবিহা খাতুনসহ অন্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ঠিক করা হয়েছে বরেণ্য এই লেখকের শেষ বিদায়ের কর্মপরিকল্পনা। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের লেখকের শেষ ইচ্ছা পূরণে যেন কোনো ঘাটতি না হয় সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। কারণ গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রাম সফরে এসে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

 

৪. লন্ডনে চিকিৎসার পর ব্যর্থ মনোরথে দেশে ফেরার সময় নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে

 

কবির জন্ম কুড়িগ্রাম শহরের থানাপাড়ায়। তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার পর ঢাকায় চলে যান। কুড়িগ্রামে তাঁর ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আজিজুল হক পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এ বাড়িতে এখন মানুষের ঢল। সবাই খোঁজখবর নিচ্ছে। কিন্তু তিনি সঠিক কোনো তথ্যই জানাতে পারছেন না। কারণ দেশবরেণ্য এই লেখককে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। এর পরই হয়তো জানা যাবে কখন কুড়িগ্রামে আনা হবে। অ্যাডভোকেট আজিজুল হক সবার কাছে দোয়া ও মঙ্গল কামনা করেছেন তাঁর প্রিয় বড় ভাইয়ের জন্য। যিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ লেখায় কুড়িগ্রামকে তুলে এনেছেন। কুড়িগ্রামকে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নে কবর কুড়িগ্রামে হবে।

কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলী জানান, সৈয়দ হক গত বছর ১৫ অক্টোবর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে বক্তব্য দেন। কুড়িগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। পরে চলতি বছর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে কুড়িগ্রামের মাটিতে শায়িত হওয়ার দ্বিতীয়বারের মতো ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই দিন তিনি কলেজের মাঠসংলগ্ন ধানক্ষেত দেখে তাঁর পছন্দের কথা জানান। এরপর কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়ে পত্র পাঠায়। সর্বশেষ গত ৭ সেপ্টেম্বর আবারও প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রাম সফরে এসে এ খবর জানতে পেরে—তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রালয়কে নির্দেশ দেন। এরপর দ্রুত সব নড়াচড়া শুরু করে। এর পরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ আসে। ইতিমধ্যে কবর স্থাপনের সব প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে।

কুড়িগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন, মূলত কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে ২০১২ সালে সৈয়দ হককে কুড়িগ্রামে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সে সময় তিনি তাঁর বক্তব্যে প্রথম জানান, মৃত্যুর পর তিনি কুড়িগ্রামের মাটিতে শায়িত হতে চান। এ ব্যাপারে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের কোনো আপত্তি নেই। কিছু জটিলতা ছিল, তা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নিরসন হয়।


মন্তব্য