kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চোখের জলে গালিবার বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চোখের জলে গালিবার বিদায়

চার দিনের আয়ুষ্কালে সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছে সেই নবজাতক গালিবা হায়াত। জন্মের পর প্রথম দফায় মৃত ঘোষণার চার দিন পর রবিবার রাতে ‘আসল মৃত্যু’ ঘটেছে তার।

গতকাল সোমবার বিকেলে তাকে দাফন করা হয়েছে ফরিদপুরে। বহুল আলোচিত এ শিশুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলছে নবজাতকের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী নানা ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ।

স্বজনরা জানায়, গত বুধবার দিবাগত রাতে জন্মগ্রহণের কিছুক্ষণের মধ্যেই নবজাতককে ‘মৃত’ ঘোষণা করেছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু ভোররাতে দাফন করতে গেলে শিশুর চিত্কার শোনা যায়। ফের হাসপাতালে নেওয়া হয় শিশুটিকে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার রাতে মৃত্যু হয় নবজাতকের।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে গালিবার লাশ গতকাল ফরিদপুরের বাড়িতে পৌঁছলে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানে অশ্রুসিক্ত ছিল উপস্থিত সবাই। বিকেল ৪টা ৫২ মিনিটে কফিন বাড়িতে নিলে স্বজনদের আর্তনাদ আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এরপর গোসল শেষে তাকে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো হয়। সন্তানহারা পিতা ফরিদপুর জেলা ক্রিকেট দলের সাবেক সদস্য নাজমুল হুদা মিঠু কোলে তুলে নেন কাফন মোড়ানো গালিবাকে। ঈদগাহ ময়দানে জানাজার পর সন্ধ্যায় গালিবার লাশ দাফন করা হয় শহরের আলীপুর কবরস্থানে।

জানাজা-পূর্ব বক্তব্যে দাদা আবুল কালাম মিয়া বলেন, ‘আমাদের মন ভেঙে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। হয়তো এটাই আল্লাহর নির্দেশ ছিল। ছোট্ট এ শিশুর চিকিৎসায় যাঁরা সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ পরিবারের সবাই। ’ শুক্রবার বাদ জুমা গালিবার কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে স্বজনরা।

ফরিদপুর শহরের কুঠিবাড়ী কমলাপুর এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হুদা মিঠুর স্ত্রী অ্যাডভোকেট নাজনীন আক্তার পপি বুধবার রাতে প্রসব বেদনা অনুভব করলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বজনরা রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁকে শহরের ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করে। কিন্তু গাইনি বিভাগের অনকল চিকিৎসক রিজিয়া আলম শয্যা সংকটের কারণে ভর্তি নিতে রাজি হননি। একপর্যায়ে চিকিৎসকের কক্ষেই সন্তান প্রসব করেন পপি। এরপর ডা. রিজিয়া আলম নবজাতককে পরীক্ষা শেষে মৃত ঘোষণা করেন। এ পরিস্থিতিতে ভোররাতে দাফনের জন্য শিশুর লাশ নেওয়া হয় কবরস্থানে। কিন্তু দাফনের আগ মুহূর্তে শিশু কেঁদে উঠলে স্বজনরা আঁতকে ওঠে। ফের নেওয়া হয় হাসপাতালে। এরপর ইনকিউবেটরে রেখে চিকিৎসা শুরু হয়। তখন তার নাম রাখা হয় গালিবা হায়াত (আয়ুষ্মান)। ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লা হিস সায়াদ নবজাতককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে গালিবাকে ঢাকায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেন। শনিবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে নবজাতককে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হয়। শুরু হয় চিকিৎসা। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এগিয়ে আসে এ নবজাতকের চিকিৎসায়। কিন্তু তার আয়ুষ্কাল দীর্ঘ করতে ব্যর্থ হয় সবাই। রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে গালিবার মৃত্যু হয়।

আলোচিত এ নবজাতকের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী ঘটনা পর্যালোচনায় গঠিত হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। চিকিৎসকদের অবহেলাসহ নানা বিষয় বিশ্লেষণ করছেন কমিটি সদস্যরা। ঘটনার পরপরই ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড. কে এম কামরুজ্জামানকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কমিটি বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়ার কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে বলে আশাবাদী।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জনের কার্যালয় কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যের তদন্তদলের প্রধান ডা. ঊষারঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, তদন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে কমিটির আরো সাত দিন সময় লাগতে পারে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. অরুণ কান্তি বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো আবুল কালাম আজাদের নির্দেশনায় ঘটনা তদন্তে পৃথক কমিটি হয়েছে। রাজবাড়ী জেলার সিভিল সার্জন ডা. রহিম বক্সকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের এ কমিটি শিগগিরই তদন্তকাজ শুরু করবে।


মন্তব্য