kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সংগীতজ্ঞ আলম খানের জন্য ভালোবাসা

নওশাদ জামিল   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সংগীতজ্ঞ আলম খানের জন্য ভালোবাসা

সুরের জাদুতে বাংলা চলচ্চিত্রকে রাঙিয়ে দেওয়া এক জাদুকরের নাম আলম খান। বরেণ্য এ সুরস্রষ্টা একাধারে গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক।

তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালকও তিনি। তাঁর সুর করা গানের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে। তাঁর সুরারোপিত অসংখ্য জনপ্রিয় গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে/সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘কী জাদু

করিলা’, ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’ ইত্যাদি সুপারহিট গান তাঁকে শুধু খ্যাতিই দেয়নি, পরিণত করেছে সংগীতজগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে।

নিভৃতচারী এই সুরস্রষ্টা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ২০১০ সালে তাঁর দেহে ক্যান্সার ধরা পড়ে। তখন ব্যাংককে গিয়ে চিকিৎসা নেন। সেখানে তাঁর ফুসফুসে অস্ত্রোপচারও করা হয়। কিছুদিন ভালো থাকার পর আবারও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত বছর তাঁর হার্টে ব্লক ধরা পড়লে একটি রিং পরানো হয়। তবু সুস্থ হয়ে উঠতে পারছেন না এই গুণী সংগীতজ্ঞ।

শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে গত রবিবার আলম খানকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে। নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন শয্যাশায়ী। তবে অবস্থা সংকটাপন্ন নয় বলে জানিয়েছেন তাঁর বড় ছেলে সংগীত পরিচালক আরমান খান। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবা এখন শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন। বয়সজনিত নানা জটিলতাও রয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যাবে। রিপোর্টগুলো হাতে পেলেই তাঁর নির্দিষ্ট চিকিৎসা শুরু হবে। ’

আরমান খান অভিযোগ করে বলেন, ‘কয়েকটি পত্রিকা ও অনলাইনে এবং ফেসবুকে বাবার যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে নেবুলাইজিংয়ের। শ্বাসকষ্ট হলে এটা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকে এটাকে অক্সিজেন মনে করছেন। দু-একটি পত্রিকায় দেখলাম অস্ত্রোপচারের কথা বলা হয়েছে। এমন তথ্য তারা কোথা থেকে পেল জানি না। পরীক্ষা-নিরীক্ষাই তো হয়নি, অস্ত্রোপচারের প্রশ্ন এলো কোথা থেকে। আর অস্ত্রোপচার যদি করতেই হয় সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানাবেন। ’ তিনি বলেন, ‘অনুরোধ করব বাবার অসুস্থতা নিয়ে যেন বিভ্রান্তি ছড়ানো না হয়। আরেকটি কথা বলতে চাই, তাঁর কোনো আর্থিক অসচ্ছলতা নেই। তিনি দুস্থ শিল্পী নন। আমরা কারো কাছে আর্থিক সাহায্য চাই না। কেবল সবার দোয়া চাই। ’

আলম খান সংগীত পরিচালক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনা করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আবদুল্লাহ আল মামুন। তাতে আলম খানের সুরে আবদুল জব্বারের কণ্ঠে গাওয়া ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর সুরে ১৯৮২ সালে ‘রজনীগন্ধা’ চলচ্চিত্রে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো’ গানটিও শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর সুরে ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের সৈয়দ শামসুল হকের লেখা গান এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’ও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

শুধু সুরস্রষ্টা নন, আলম খান অনেক সংগীতশিল্পীকেও হাতে ধরে জনপ্রিয় করেছেন। জনপ্রিয় শিল্পী এন্ড্রু কিশোর ও শাম্মী আখতার তাঁর হাত ধরেই চলচ্চিত্রে গান শুরু করেন। উপমহাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কুমার শানুও এই আলম খানেরই আবিষ্কার। বাংলা চলচ্চিত্রকে কালজয়ী গানে ভরপুর করে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এ গুণী সুরকার। বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনবার। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সাতবার। প্রযোজক সমিতি পুরস্কার পেয়েছেন চারবার।

বরেণ্য এই সংগীতজ্ঞের পুরো নাম খুরশীদ আলম খান। জন্ম ১৯৪৪ সালের ২২ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের বানিয়াগাতি গ্রামে। জন্মের পর কিছুদিন সিরাজগঞ্জে ছিলেন। বাবা চাকরি করতেন কলকাতায়। পরে তিনি সেখানে চলে যান। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাবার সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। তারপর তাঁরা ঢাকাতেই স্থায়ী হন। মা জোবেদা খানম ও বাবা আফতাব উদ্দিন খানের দ্বিতীয় সন্তান আলম খান। বাংলাদেশে পপ সংগীতের সম্রাট আজম খান তাঁর ছোট ভাই। আলম খান ১৯৭৬ সালে হাবিবুননেসা গুলবানুর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। দুই ছেলে আরমান খান ও আদনান খান এবং একমাত্র কন্যা আনিকা খান। তাঁর স্ত্রী গুলবানু খানও গান লেখেন এবং দুই ছেলেও সংগীত পরিচালক।


মন্তব্য