kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিচারক নেই চার মাস, ছয় হাজার মামলার বিচার বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিচারক নেই চার মাস, ছয় হাজার মামলার বিচার বন্ধ

রংপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বিচারক নেই প্রায় চার মাস। এ কারণে বন্ধ হয়ে আছে প্রায় ছয় হাজার মামলার বিচারকাজ।

জরুরি ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে আইনজীবী সমিতি।

আইনজীবী ও ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম দিকে রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক অবসরে চলে যান। এর পর থেকে এ আদালতে কোনো বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। জরুরি প্রয়োজনে ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন জেলা ও দায়রা জজ। তবে তাঁর নিজের আদালতে মামলার চাপও যথেষ্ট। দুটি আদালতের দায়িত্ব পালন করতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আইনজীবীরা বলেছেন, বিচারক না থাকায় দিনের পর দিন নতুন মামলা দায়ের করা ও প্রতিদিনকার মামলার শুনানি সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বিচারাধীন যে ছয় হাজার মামলা রয়েছে, তার বিচারও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে গিয়ে দেখা যায়, বিচারপ্রার্থী অনেক নারী ও পুরুষ এজলাস কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছে। তাদের মধ্যে আছে একটি মামলার আসামি গঙ্গাচড়া উপজেলার ধামুর গ্রামের শাহাজাহান মিয়াসহ কয়েকজন। তারা জানায়, ১২ বছর ধরে মামলাটি চলছে। এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ধার্য দিনে আদালতে আসছে আর হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত মামলার সাক্ষ্যগ্রহণই শুরু হয়নি। অথচ মামলার তারিখে আইনজীবী ও তাঁদের সহকারীর ফি, যাতায়াত খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। মামলার খরচ জোগাতে ইতিমধ্যে দেড় বিঘা জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। বদরগঞ্জের কুতুবপুর নাগেরহাট এলাকা থেকে আসা সাবিত্রি রানী জানান, দুই বছর আগে করা একটি মামলার আসামি তিনি। তখন থেকে প্রতি তারিখে আদালতে আসছেন, হাজিরা দিচ্ছেন আর বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। বিচার কবে শুরু হবে, তা জানেন না। আদালতে এসে শুনছেন বিচারক নেই।

পীরগঞ্জের খালাসপীর গ্রামের মমতা বেগম জানান, ১১ বছর আগে তিনি ধর্ষণের শিকার হলে থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। আসামিরা জামিনে রয়েছে। কিন্তু ১১ বছরে মামলার বিচারকাজই শুরু হয়নি। আজ অবধি একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়নি। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘তাহলে আর কত বছর লাগবে মামলার বিচার শেষ হতে?’

বিচারপ্রার্থীদের হয়রানির বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশ, রংপুর শাখার আহ্বায়ক এম এ বাশার বলেন, রংপুরে নারী নির্যাতনের হার অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি। এখানে আগে দুটি ট্রাইব্যুনাল ছিল। সেখানে দুজন বিচারকও ছিলেন। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে একটি আদালত এখান থেকে নরসিংদী জেলায় নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে একটি আদালত ও একজন বিচারক দিয়ে কোনো রকমে বিচারকাজ চলছিল। এসব কারণে এখানে যে মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে তা আর কমানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তার ওপর চার মাস ধরে বিচারক নেই। এ অবস্থায় বিচারপ্রার্থীরা বিচার পাচ্ছে না জানিয়ে এ আইনজীবী বলেন, ‘এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

এ ব্যাপারে রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন বলেন, ‘নারী নির্যাতন মামলায় যেখানে তিন মাসের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার কথা, সেখানে মামলার তারিখ পড়ে বছরে দুইটা। এখানেই আইনের লঙ্ঘন হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য রংপুরে কমপক্ষে দুজন বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। ’

অন্যদিকে একই আদালতের আরেকজন বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি রফিক হাসনাইন জানান, রংপুরে নারী নির্যাতন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তিনজন বিচারক নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। কিন্তু বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ায় বিচারক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির। তিনি স্বীকার করেন, শুধু ১২ বছর নয়, ১৮ বছর ধরে বিচারপ্রার্থীরা আদালতে আসছে আর ঘুরে যাচ্ছে এমন মামলাও রয়েছে। তবে দ্রুতই রংপুরে তিন বিচারক নিয়োগ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেকের সঙ্গে  যোগাযোগ করা হয়। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, বিষয়টি সমিতির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।


মন্তব্য