kalerkantho


চট্টগ্রামে ডেমু ট্রেন

লাভের আশা ৯৯ কোটি বাস্তবে সাড়ে ৩

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



লাভের আশা ৯৯ কোটি বাস্তবে সাড়ে ৩

প্রতি অর্থবছরে ৯৯ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন নিয়ে পৌনে ৭০০ কোটি টাকায় চীন থেকে ২০ সেট ডেমু (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) ট্রেন আমদানি করা হয়। ইতিমধ্যে তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে। বছরে আয় হচ্ছে গড়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা। এসব ট্রেন চালাতে ব্যয় হচ্ছে গড়ে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা বহুল আলোচিত ডেমু ট্রেন নিয়ে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ায় তিন বছর পর এসে রেলওয়ে নিরীক্ষা অধিদপ্তর এসব ট্রেনের পরিচালনাসংক্রান্ত নিরীক্ষা করেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন এখন যাচাই-বাছাই চলছে। চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

এই নিরীক্ষায় ডেমু ট্রেন আমদানি ও আয়-ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। অবশ্য এ ব্যাপারে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।

জানতে চাইলে রেলওয়ের নিরীক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নূর নাহার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে ডেমু ট্রেন নিয়ে পারফরম্যান্স অডিট হয়েছে। তবে কত টাকা আয়ের (অর্থবছর) কথা বলা হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। আমি অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে আছি। তবে এটুকু বলতে পারি অতিরিক্ত আয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। বরং লোকসান হচ্ছে। ’

নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নূর নাহার বলেন, ‘যে অডিট হয়েছে সেটি এখন চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে আছে। অডিট প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর সংসদে যাবে। ’ তিনি জানান, ট্রেনগুলো যেসব রুটে চলাচল করার কথা ছিল সেসব রুটে চলেনি। স্বল্প দূরত্বের (২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার) ট্রেনগুলো চলাচল করার কথা ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা দীর্ঘ পথে চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া আরো কিছু বিষয় নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ সালের প্রথম দিকে চীনের তাংসাং রেলওয়ে ভেহিক্যাল কম্পানি লিমিটেড থেকে সামনে ও পেছনে দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট ২০ সেট ডেমু কমিউটার ট্রেন আমদানি করা হয়। আমদানি বাবদ খরচ হয়েছে ৬৮৬ কোটি টাকা। প্রতি সেটে তিনটি বগি। প্রতি সেটে যাত্রী ধারণক্ষমতা আসন ও দাঁড়িয়ে মিলে ৩০০ জন। রেলের বাণিজ্যিক, পরিবহন ও প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এড়িয়ে এই ডেমু ট্রেন আমদানি করা হয়। ট্রেনগুলোর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে (পূর্বাঞ্চল) ১৮ সেট এবং পশ্চিমাঞ্চলে দুই সেট নামানো হয়।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুটে দুই সেট ডেমু ট্রেন নামানো হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রুটে দুই সেট, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ দুই সেট, আখাউড়া-কুমিল্লা-ঢাকা ও কুমিল্লা-আখাউড়া রুটে দুই সেট, ঢাকা-জয়দেবপুর-ঢাকা ও ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা দুই সেট ট্রেন দেওয়া হয়। এ ছাড়া লাকসাম-চাঁদপুর এক সেট, লাকসাম-নোয়াখালী এক সেট, সিলেট-আখাউড়া-সিলেট এক সেট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-চট্টগ্রাম এক সেট, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট এক সেট, চট্টগ্রাম নগরে সার্কুলার রুটে এক সেট দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে ঠাকুরগাঁও-পার্বতীপুর এক সেট ও রংপুরে এক সেট ট্রেন চলছে। কিন্তু ২০ সেটের মধ্যে এখন ১১ সেট চালু আছে বলে জানা গেছে। বাকিগুলো বিকল হয়ে মেরামতের অপেক্ষায় আছে।

বাংলাদেশ রেলের আন্তনগর, মেইল এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেনে দিন দিন যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও ডেমু ট্রেনে কমছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২১ লাখ ৭৪ হাজার ৯০২ জন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৯ জন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৫ জন যাত্রী ডেমু ট্রেনে ভ্রমণ করেছে। আয় হয়েছে যথাক্রমে তিন কোটি ৫১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৪ টাকা, তিন কোটি ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৭৬৩ টাকা ও চার কোটি ২৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৫৫ টাকা। সব মিলিয়ে গত তিন অর্থবছরে মোট যাত্রী ৫৫ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৭ এবং মোট আয় ১০ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ৩৮২ টাকা। প্রতি অর্থবছরে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা আয়।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরে ছয় থেকে সাত সেট ডেমু ট্রেন বিকল হয়ে গেছে। যত দিন যাচ্ছে বিকল ট্রেনের সংখ্যাও বাড়ছে। এসব ট্রেন মেরামতের জন্য দুই থেকে তিন শ কোটি টাকা লাগতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ১৯৬৫ সালে জার্মানি থেকে আমদানি করা ট্রেনের বগির সেবা দেওয়ার সময়সীমা ৩০ বছর হলেও ওই বগিগুলো অতিরিক্ত ২১ বছর সেবা দিচ্ছে। ধরতে গেলে ৫১ বছর চলছে এসব বগি। এ থেকে আয় দিন দিন বাড়ছে। শুধু তাই নয়, জাপান, হাঙ্গেরি ও ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা আরো কিছু বগি রয়েছে যেগুলো ৪০-৫০ বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ রকম প্রায় ১০০টি বগি আছে। অথচ চীন থেকে আমদানি করা ডেমু ট্রেন সাড়ে তিন বছর না যেতেই বিকল হয়ে যেতে শুরু করেছে।

ডেমু ট্রেনের আয়-ব্যয় এবং বিকল ট্রেনের মেরামত বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিন বলেন, ‘এসব বিষয় আমার জানা নেই। এগুলো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারবেন। ’

এরপর রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সরদার শাহাদাত আলী, প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী হারুন উর রশিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অনেকবার চেষ্টা করেও তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কেউ ফোন ধরেননি।

পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবদুল হাই বলেন, ‘ডেমু ট্রেনের বিষয়ে আমি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারব না। আমাদের সিএমই (হারুন উর রশিদ) আছেন। উনার সঙ্গে কথা বলে আপনি এ ট্রেন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জেনে নিতে পারেন। ’

আব্দুল হাই আরো বলেন, ‘আমাদের তো কোনো ট্রেনেই লাভ নেই। যা আয় হয় তার চেয়ে খরচ বেশি। এটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। আমরা যাত্রীসেবার কথা চিন্তা করেই ট্রেন পরিচালনা করছি। ’


মন্তব্য