kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কথা রাখেনি বিএসএফ

রৌমারী সীমান্তে ৯ মাসে ৬ হত্যা, আহত ১৪

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সীমান্ত হত্যা বন্ধে কথা দিলেও তা রাখেনি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা সীমান্তে ছয় বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে তারা।

একই সময়ে পাথর ও গুলতি আক্রমণে আহত হয়েছে আরো ১৪ জন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও থানার পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

তবে এ সময়ে জেলার রাজীবপুর, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী সীমান্তে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। শুধু রৌমারী সীমান্তে প্রায় ৪৫ কিলোমিটারজুড়ে বিএসএফ অব্যাহত আক্রমণ চালাচ্ছে। যদিও বিগত ২০১৫ ও ২০১৪ সালে এই এলাকায় বিএসএফের হামলায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করে, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নাগরিকরা গরু নামিয়ে দেয়। বাংলাদেশিরা তা গ্রহণ করে। এই গরু নামানোর ঘটনায় উভয় দেশের নাগরিকরা সমান অপরাধী। অথচ বিএসএফ জওয়ানরা তাঁদের দেশের মানুষকে কিছুই করছেন না। সব দোষ বাংলাদেশিদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গুলি করে হত্যা করছেন। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুসারে গুলি করার নিয়ম নেই; কিন্তু বিএসএফ সদস্যরা তা মানছেন না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিএসএফের হাতে সর্বশেষ নিহতের ঘটনা ঘটেছে  রবিবার ভোরে। ছাটকরাইবাড়ী সীমান্তে গরু আনতে গেলে ভারতের গুটালু বিএসএফ ক্যাম্পের জওয়ানরা গুলি করেন। এতে বাহারুল ইসলাম (২৬) নিহত হন। এ সময় জাকির হোসেন (৩০) গুলিবিদ্ধ হন। একইভাবে গত শুক্রবার ভোরে গয়টাপাড়া ফকিরপাড়া গ্রামের দুখু মিয়া (২৭) নিহত হন এবং মজনু মিয়া (২৮) আহত হন।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে ধর্মপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে সেলফি তুলতে যায় শিক্ষার্থীরা। তাদের লক্ষ্য করে বিএসএফ পাথরের টুকরা ভরে গুলতি আক্রমণ চালায়। এতে পাঁচ ছাত্র আনিছুর রহমান (১৩), একরামুল হক (১৭), ময়নাল হোসেন (১৪), আরিফুল হক (১৬) ও মিজানুর রহমান (১৫) আহত হয়।

গত ১ সেপ্টেম্বর উত্তর রহিমপুর সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা নির্যাতন করে নুরু ইসলামকে (৫০) নির্মমভাবে হত্যা করেন। তিনি বকবান্দা গ্রামের কেরামত আলীর ছেলে। ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পের জওয়ানরা তাঁর লাশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে ফেলে রাখেন।

গত ৯ আগস্ট খেতারচর সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলির মুখে পড়ে নুরুল আমিন (৩৫) নিহত হন এবং আরো দুজন আহত হন। আহতরা হলেন জাইদুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম। এ হত্যার ঘটনায় বিএসএফের বিরুদ্ধে রৌমারী থানায় মামলা করা হয়েছে।

গত ১৩ জুলাই বিএসএফ সদস্যরা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করেন বাংলাদেশি নাগরিক রাশেদুল ইসলামকে। উপজেলার ভন্দুরচর সীমান্তঘেঁষা কালো নদী দিয়ে গরু নামানোর সময় ভারতের সাপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের জওয়ানরা পাথর নিক্ষেপ করেন। পাথরের আঘাতে নিহতের মাথা থেঁতলে গিয়ে নদীতে ডুবে যায়। এক দিন পর লাশ ভেসে ওঠে।

গত ২০ জুন ছাটকড়াইবাড়ী সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে গুলতি আক্রমণ চালান। গরু ব্যবসায়ী ফারুক মিয়া (৪০), আবেদ আলী (৩৫) ও জহুরুল ইসলাম (৪৫) আহত হন।

গত ১৭ এপ্রিল মোল্লারচর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে গরু ব্যবসায়ী মনছের আলী (৪৩) নিহত হন। তাঁর বাড়ি উপজেলার বামনেরচর পশ্চিমপাড়া গ্রামে।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাবেদ আলীকে (৩৬) ধরে নিয়ে নির্যাতন চালান ভারতের ঝালরচর বিএসএফ ক্যাম্পের জওয়ানরা। নির্যাতনের পর আধামরা করে তাঁরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে ভুট্টাক্ষেতে ফেলে রেখে যান।   গত ৮ জানুয়ারি মমিনুল ইসলাম মুনকে (২৮) ধরে নিয়ে যান ভারতের দিয়ারারচর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা। ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে আধামরা অবস্থায় চরের গ্রাম নো ম্যান্স ল্যান্ডে ফেলে রাখে।

রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘বিএসএফের হাতে নিহতের প্রতিটি ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা করা হয়। পরে মামলার তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আমরা কিছু করতে পারি না। বলতে গেলে বাধ্য হয়েই আমরা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করি। এতে মামলাটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ’

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা প্রতিটি মাসিক সভায় চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য বন্ধের করণকৌশল নিয়ে আলোচনা করি। এতে সীমান্তে চোরাচালান অনেকটা কমে গেছে। ’

বিজিবি জামালপুর ৩৫ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল হাসান বলেন, ‘সীমান্তে হত্যা বন্ধে আমরা বিএসএফের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আলোচনায় বসি। বিএসএফ সীমান্ত হত্যা বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা রক্ষা করছে না। ’


মন্তব্য