kalerkantho


লোকসান শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



লোকসান শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

ট্যাংক দুর্ঘটনার এক মাস পরও উৎপাদনে যেতে পারেনি চট্টগ্রামের ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানা। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, সময়মতো কারখানার ওভারহলিং না হওয়ায় এই বিপুল ক্ষতি গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি সার কারখানার মধ্যে যমুনা সার কারখানা বাদে সব প্রতিষ্ঠানেই নিয়মিত ওভারহলিং কাজ হয় না। ফলে যেকোনো সময় কারখানাগুলোতে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

নিয়মিত ওভারহলিং না হওয়ায় দিন দিন কমছে কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা। চট্টগ্রামে ডিএপি সার কারখানার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। অথচ বর্তমানে উৎপাদন করতে পারে এক হাজার টন। কর্মকর্তারা জানান, প্রতি টন ডিএপি সার বিক্রি হয় ২৩ হাজার টাকা দরে। সেই হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কারণে কারখানাটি বন্ধ থাকায় গত এক মাসে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৯ কোটি টাকার বেশি। দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত তদন্ত কমিটি ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করতে গিয়ে উল্লেখ করেছে, বিস্ফোরিত ট্যাংকটির মূল্য ছয় কোটি টাকা, নতুন ট্যাংক নির্মাণে ব্যয় হবে ২০-২২ কোটি টাকা, গ্যাসের বিষক্রিয়ায় প্রাণী ও মত্স্যসম্পদের ক্ষতি আরো দেড় কোটি টাকা। তবে বিস্ফোরিত ট্যাংকে থাকা ৩৪০ টন অ্যামোনিয়া গ্যাসের দাম নিরূপণ করেনি কমিটি। এই গ্যাসের বাজারমূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এ ছাড়া এক মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ৩৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-বোনাস থেমে নেই। সেই হিসাবে কারখানাটিতে ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি। উপরন্তু আগামী তিন মাসেও এই কারখানার উৎপাদন শুরু করা যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এর কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় ডিএপি সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমল বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, ডিএপি সার কারখানা পরিচালনা পর্ষদের বোর্ড চেয়ারম্যান হলেন বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল। তিনি বিসিআইসিতে যোগদানের পর এ পর্যন্ত ডিএপির বোর্ড মিটিং করেছেন ২৪টি।

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেশ কয়েকবার বোর্ড মিটিংয়ে ডিএপি সার কারখানার ওভারহলিং কাজ করার প্রস্তাব তোলা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বোর্ড চেয়ারম্যান তা অনুমোদন দেননি। ’

বর্তমানে বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি সার কারখানার মধ্যে চালু আছে দুটি (যমুনা ও শাহজালাল)। যন্ত্রপাতি বিকল ও জ --ালানি সংকটের কারণে বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কর্মকর্তারা আরো জানান, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে। রিঅ্যাক্টর বিকল থাকায় উৎপাদনে যেতে পারছে না কারখানাটি। নতুন রিঅ্যাক্টর ক্রয়ের বিষয়টি অনুমোদন হলেও অজ্ঞাত কারণে তা কেনা হচ্ছে না। বিদেশ থেকে প্রকৌশলী এনে মেরামতের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু তাহের ভূঁইয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সার কারখানার ক্ষেত্রে দুই বছর অন্তর ওভারহলিংয়ের নিয়ম রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও হয়। বিভিন্ন সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থ সংকটসহ নানা জটিলতায় যথাসময়ে ওভারহলিং হয় না। আর কারখানার অফ-সিজনে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করলে অনেক ক্ষেত্রে ওভারহলিং দেরিতে করলেও চলে। তিনি আরো জানান, আগামী ডিসেম্বরে টিএসপি সার কারখানায় সংস্কারকাজ করা হবে। এতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

একাই আট কম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান : বিসিআইসির অধীনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬টি। এর মধ্যে সার কারখানা আটটি। আর বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল একাই এই আট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান। বাকি আটটি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড চেয়ারম্যন হলেন বিসিআইসির চার পরিচালক ও সচিব। এর আগে বিসিআইসির কোনো চেয়ারম্যান একসঙ্গে আটটি কম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান থাকেননি।

বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, প্রতি মাসে একেকটি কম্পানির একটি করে বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিসিআইসির চেয়ারম্যান বিভিন্ন অজুহাতে বছরের অধিকাংশ সময় বিদেশ ভ্রমণে থাকেন। এতে প্রশাসনিক কাজে ব্যাঘাত ঘটে।

এ প্রসঙ্গে জানতে বিসিআইসি চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, গত শনিবার তিনি জাপান সফরে গেছেন। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় বিসিআইসির পরিচালক (প্রকৌশল) ইঞ্জিনিয়ার আলী আক্কাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।

 


মন্তব্য