kalerkantho


বিআইডিএসের সাফল্যে ‘ভাটা’

আরিফুর রহমান   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিআইডিএসের সাফল্যে ‘ভাটা’

সরকারের একমাত্র গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাফল্যে চিড় ধরেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অবনমন হয়েছে গবেষণার মানে, প্রতিবেদন প্রকাশে ও সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের থিংক ট্যাংক অ্যান্ড সিভিল সোসাইটিস প্রোগ্রামস (টিটিসিএসপি) প্রতিবছর বিশ্বের গবেষণা সংস্থাগুলোর একটি তালিকা করে। তাতে ২০১৫ সালে প্রায় সব ক্যাটাগরিতেই অবস্থান হারিয়েছে বিআইডিএস। ২০১৪ সালে বিশ্বের আট হাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০০-এর ভেতরে জায়গা করে নিয়েছিল সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সংস্থাটি। কিন্তু ২০১৫ সালে অবনমন হয়েছে পাঁচ ধাপ। বিশ্বসেরা সাত হাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআইডিএসের স্থান এখন ১০২তম। আগের বছর এ অবস্থান ছিল ৯৭তম।

সম্প্রতি বিশ্বের সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নিরূপণ করা সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টিটিসিএসপি কর্তৃপক্ষ। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করতে গিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে ওই বছর মানসম্পন্ন গবেষণা তৈরি হয়েছে কি না, গবেষণার বৈচিত্র্য কেমন, কত সংখ্যক জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে, নেত্বত্ব সঠিক পথে আছে কি না, প্রতিষ্ঠানের গবেষণার কাজে গুণগত মান এবং ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও গভর্নিং বোর্ডের সদস্যদের আন্তরিকতা ও গবেষকদের খ্যাতি ইত্যাদি বিষয় দেখা হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদন ওই দেশের নীতিনির্ধাকরা কতটুকু গ্রহণ করেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে কি না কিংবা ওই প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সচ্ছল কি না সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়নের সময় এসব বিষয়ও দেখা হয়।

বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ওই তালিকা করে টিটিসিএসপি। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্য দেশগুলোর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওপর করা জরিপেও বিআইডিএস তাদের অবস্থান হারিয়েছে। এ ক্যাটাগরিতে সর্বশেষ তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ১১৯তম। আগের বছর ছিল ৯৯তম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ২০ ধাপ নিচে নেমে গেছে বিআইডিএস।

তবে কিছুটা আশার খবর হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ক্যাটাগরিতে বিআইডিএস এক ধাপ এগিয়েছে। আগের বছর প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ছিল ১৭তম। ২০১৫ সালে অবস্থান হয়েছে ১৬তম।

এক বছরের ব্যবধানে বিআইডিএস কেন তাদের অবস্থান হারাল—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এ মাসের শেষের দিকে টিটিসিএসপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কথা রয়েছে। তারা কোন প্রক্রিয়ায় এই তালিকা প্রণয়ন করে সে বিষয়ে আলোচনা করব। ’

কে এস মুরশিদ আরো বলেন, ‘বিআইডিএসের অবস্থান অবনমন হয়েছে, তার মানে এই নয় যে সংস্থাটির কাজের মান খারাপ হয়েছে। আমি বলব বরং আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে বিআইডিএসের কাজের প্রচারণা বাড়ানো জরুরি। এতে এর কাজ সম্পর্কে মানুষ আরো বেশি করে জানতে পারবে। ’

২০১৪ সালে বিআইডিএসের মহাপরিচালক ছিলেন মোস্তফা কে মুজেরি। তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠানটি সেরা ১০০-এর মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল। সর্বশেষ তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির অবনমনের বিষয়ে মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘বিআইডিএসের অবস্থান নেমে যাওয়ার পেছনে আমি দুটি কারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। প্রথমত, গত বছর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান আমাদের চেয়ে ভালো করেছে, সে জন্য তারা এগিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, বিআইডিএস আগের বছর যে পারফরম্যান্স করেছে, গত বছর সেটা করতে পারেনি। তবে আমাদের হারানো স্থান ফিরে পেতে হবে। সে জন্য কাজের গতিও বাড়াতে হবে। ’

গবেষণার কাজে বিআইডিএস কেন খারাপ করেছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক একাধিক গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকারের নীতিনির্ধাকরা বিআইডিএসকে সেভাবে গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেন না। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে অনেক দক্ষ ও যোগ্য গবেষক আছেন। কিন্তু তাঁদের কাজে লাগানো হয় না। বিআইডিএসকে দিয়ে কাজ করালে সরকার নিজেই উপকৃত হবে।

প্রসঙ্গত, টিটিসিএসপি ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালিয়ে একটি তালিকা করে। এ নিয়ে নবমবারের মতো থিংক ট্যাংক সূচক প্রকাশ করল প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সব গবেষণা সংস্থার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্যের চেথাম হাউস ও যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস।

২০১৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৯৫টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআইআইএসএসের (বাংলাদেশের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ) অবস্থান ২০তম। এ ছাড়া অলটারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা এডিআই ৪৮তম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ৫০তম, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট ৫২তম এবং ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজ ৫৩তম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ৩৫টি গবেষণা সংস্থা এ জরিপে অংশ নিয়েছে।


মন্তব্য