kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১৪ বছর ধরে শিকলবন্দি

রাজুকে শৈশব থেকেই বেঁধে রাখা হতো। তাঁর বয়স এখন ১৭

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



১৪ বছর ধরে  শিকলবন্দি

প্রতিবন্ধী বলে বরগুনার পাজরাভাঙ্গা গ্রামে ১৪ বছর ধরে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে কিশোর রাজুকে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরগুনায় জেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র আছে। আছেন জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তাও।

তার পরও ১৪ বছর ধরে শিকলবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে বরগুনা সদর উপজেলার পাজরাভাঙ্গা গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর জাকির হোসেনের ছেলে রাজুকে।

রাজুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বেলা খাবার জোগাতে দিনমজুরের কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকতে হতো মা-বাবা দুজনকেই। তাই ছোট্ট শিশু রাজুকে শৈশব থেকেই বেঁধে রাখা হতো। রাজুর বয়স এখন ১৭। বয়স বেড়েছে তার। বাড়েনি শিকলের দৈর্ঘ্য। এখনো রাজুর পৃথিবী আটকে আছে তিন ফুট দীর্ঘ সেই একই শিকলে!

দীর্ঘ এ বন্দি জীবনে রাজুকে দেখাশোনা করতেন রাজুর মা রীনা আক্তার (৩৫)। রাজুর পাশে সেই মাও আজ নেই। রোগ-শোকের অভাবী সংসারে অসুস্থ হয়ে দরিদ্র মা রীনা আক্তারের মৃত্যু হয়েছে বছর তিনেক আগে। রাজুর দিনমজুর বাবা জাকির হোসেন (৪০) বলেন, রাজু ছাড়াও আরো দুটি শিশুসন্তান রয়েছে তাঁর। দিনভর তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয় দিনমজুরের কাজে। রাজুকে দেখাশোনার এখন আর কেউ নেই।

অসহায় বাবা রাজুর সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, সুস্থ সবল ফুটফুটে হয়ে জন্মেছিল রাজু। বছর তিনেক যেতে না যেতেই হঠাত্ অজানা এক রোগে আক্রান্ত হলো রাজু। হঠাত্ খিচুনি তারপর বেহুঁশ। দুই দিন পরে সুস্থ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্থানীয় ওঝা, বৈদ্য আর কবিরাজের ভুল চিকিত্সার পাশাপাশি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে শিকলবন্দি থাকায় একসময় মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে রাজু। রাজু যখন ছোট তখন ডাক্তার বলেছিল ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিত্সা করাতে পারলে ভালো হয়ে যাবে রাজু। সে সময় অর্থাভাবে ঢাকায় নিয়ে চিকিত্সা করাতে পারেননি তিনি।

রাজুর শারীরিক ও মানসিক চিকিত্সার বিষয়ে জানতে চাইলে মনোচিকিত্সক রুমা খন্দকার জানান, ছোটবেলা থেকে একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করা গেলে রাজু কিছুতেই এমন হতো না। তিনি বলেন, যেহেতু রাজু হাঁটাচলা করতে পারে, খেতে পারে, কথা বলতে পারে, এমনকি কারো প্রতি রাগও দেখাতে পারে সেহেতু ভালো পরিবেশে তার যথাযথ চিকিত্সা করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রুমা খন্দকার আরো জানান, এ ধরনের প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে প্রায় প্রতিটি জেলায়ই প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র রয়েছে। বরগুনায় যদি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কার্যালয় থেকে থাকে এবং তারা যদি এত দিনেও রাজুর কোনো খোঁজ না নিয়ে থাকে তাহলে তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছে বলেই ধরে নিতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চৌদ্দ বছরে প্রতিবন্ধী রাজু ও তার পরিবারের খোঁজ নেননি উল্লেখযোগ্য কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতারা। এমনকি পেশাগত দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও রাজুর পাশে দাঁড়ায়নি খোদ সরকারের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বরগুনা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র। রাজুর দরিদ্র বাবা জাকির হোসেন বলেন, একাধিকবার তিনি বরগুনার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো সেবা তিনি পাননি।

এ বিষয়ে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাজুর বিষয়টি মনে করতে পারছেন না জানিয়ে বলেন, ‘না দেখে কিছু বলা যাবে না। ’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বরগুনা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম আহাদ সোহাগ বলেন, ‘পাজরাভাঙ্গা গ্রামে রাজু নামের একটি প্রতিবন্ধী ছেলে আছে বলে জানি। তবে তাকে বেঁধে রাখা হয় বলে আমার জানা ছিল না। ’ বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের জেলা প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, রাজুর বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। এ প্রতিবেদকের কাছ থেকেই তিনি রাজুর বিষয়ে প্রথম শুনলেন। রাজুর বিষয়ে তিনি খোঁজ নেবেন বলেও জানান।


মন্তব্য