kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বঞ্চিত-অবমূল্যায়িত বিএনপি নেতারা শলা-পরামর্শ করছেন

শফিক সাফি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বঞ্চিত-অবমূল্যায়িত বিএনপি নেতারা শলা-পরামর্শ করছেন

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে গত মাসে, গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে। খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এসবের মধ্যে রয়েছে ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির অর্ধশতাধিক বিতর্কিত নেতার বিষয়ে অভিযোগ বা সমালোচনার পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া, গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে ও চেয়ারপারসনকে ভুল বুঝিয়ে যেসব নেতাকে স্থান দেওয়া হয়েছে তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং যাঁরা পদবঞ্চিত হয়েছেন বা প্রত্যাশা অনুযায়ী পদ পাননি তাঁদের পুনর্মূল্যায়ন করা।

এসব বিষয়ে কাজ চলছিল বেগম জিয়ার নির্দেশনায়। কিন্তু হজ করতে সৌদি আরবে যাওয়ার কারণে সব কিছু থেমে যায়। ফলে কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে সৃষ্ট অসন্তোষ দূর হয়নি। পদবঞ্চিত বা অবমূল্যায়িত নেতারা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। তাঁরা চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের আপত্তি-অসন্তোষের কথা জানাবেন। এতে কাজ না হলে তাঁরা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন।

এসব ব্যাপারে কাজ করছেন এমন কয়েকজন নেতার দাবি, নতুন প্রায় ৪০০ পদ সৃষ্টি হবে। পর্যায়ক্রমে পদবঞ্চিত বা অবমূল্যায়িত নেতাদের পদ দেওয়া হবে। তখন আর অসন্তোষ থাকবে না।

স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপির মতো বড় ও জনপ্রিয় দলের কমিটি গঠনে কিছু সমস্যা থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, গত ৬ আগস্ট বিএনপির ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি, ১৭ সদস্যের স্থায়ী কমিটি ও চেয়ারপারসনের ৭৩ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ ঘোষণা করা হয়। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, পদবঞ্চনা ও অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে কমিটি ঘোষণার পরই নেতাদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়।

কমিটি ঘোষণার পরই ভাইস চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন মোসাদ্দেক আলী ফালু। ওই দিন বিকেলে পদত্যাগ করেন সহপ্রচার সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম। পরে পদত্যাগ করেন নির্বাহী কমিটির সদস্য মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল। যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি এ কথা বলে পদত্যাগ করেন মহিলা দলের নেত্রী শিরিন সুলতানা ও আশিফা আশরাফী পাপিয়া।

প্রত্যাশিত পদ পাননি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, আমানউল্লাহ আমান, নাজিমউদ্দিন আলম, ফজলুল হক মিলন, নাদিম মোস্তফা, গোলাম আকবর খন্দকার, মিজানুর রহমান মিনু, মশিউর রহমান, ডা. মাজহারুল ইসলাম দোলন, আবদুল লতিফ জনি, বজলুল করিম চৌধুরী আবেদসহ প্রায় অর্ধশত নেতা।

বিএনপির বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত আবু নাসের মো. ইয়াহিয়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহসম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল, সদস্য খান রবিউল ইসলাম ও আলী আশরাফসহ বেশ কয়েকজনকে নিয়ে দলের ভেতরে সমালোচনা চলছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, আবু নাসের মো. ইয়াহিয়া কোনো দিন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের মালিক জাকারিয়া তাহের সুমন চেয়ারপারসনকে ভুল বুঝিয়ে ইয়াহিয়াকে এ পদ পাইয়ে দিয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দলের জন্য কোনো কাজ করেন না। কাউন্সিলে ব্যাগ সরবরাহ করার জন্য পদ পেয়েছেন তিনি। যুবদলের কোনো পদে না থেকেও যুবদলের কোটায় পদ পেয়েছেন খান রবিউল ইসলাম। ফরিদপুরের রাজনীতিতে যাঁকে কখনো দেখা যায়নি সেই আলী আশরাফ ওই জেলার কোটায় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ পেয়েছেন। সেখানে দলের পক্ষে কাজ করেন মাহবুবুল হাসান পিঙ্কু। তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

পদবঞ্চিত ও অবমূল্যায়িত নেতারা এখন শলা-পরামর্শ করছেন। ঈদ পুনর্মিলনীর নামে গত সপ্তাহে দলের একজন উপদেষ্টা ও একজন সম্পাদকের বাসায় আলাদা বৈঠক হয়। উভয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে আমার কমিটির কর্মী ছিল তাকে করা হয়েছে সহসাংগঠনিক সম্পাদক। এখন দলের কর্মসূচিতে গেলে তাকে চেয়ার ছেড়ে দিতে হবে পদের কারণে। তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিচ্ছি না। আবার আমরা চেয়ারপারসনকেও দায়ী করছি না। তাঁকে ভুল বুঝিয়ে নানা অপকর্ম করেছে একটি সিন্ডিকেট। ’ তিনি বলেন, ‘মান-সম্মান নিয়ে রাজনীতি করতে চাই। হয় বিদ্রোহ করব, না হয় রাজনীতি ছেড়ে দেব। ’

স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকের পর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ শাহজাহানকে পুনর্মূল্যায়নের বিষয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে। তিনি বঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, এক নেতার এক পদ বিধান চালু হওয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রায় ৬০টি পদ খালি হবে। এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক ২৫টি উপকমিটির প্রতিটিতে ১২টি পদ সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করে পাঁচজনের (সুপার ফাইভ) কমিটি করে দেওয়া হবে। তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলেও সুপার ফাইভ কমিটি করার কাজ চলছে। যেকোনো সময় ঘোষণা করা হবে। সব মিলিয়ে আরো ৪০০ পদ সৃষ্টি হবে। এসব পদে বঞ্চিতদের সুযোগ দেওয়া হবে। তখন আর ক্ষোভ থাকবে না।

সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাহী কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা ও বেশ কিছু সাংগঠনিক কাজ শেষ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে অনেক দূর গুছিয়ে রেখেছিলেন তিনি। চেয়ারপারসনের কাছে ফাইল জমা দেবেন যেকোনো দিন।

যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, খুব শিগগির পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী কমিটিসহ সহযোগী সংগঠনের কমিটি ঘোষণা করা হবে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে এসব কাজ চলছে।


মন্তব্য