kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আদিবা হত্যা মামলা

প্রথম দায় স্বীকারকারীকে বাদ দিয়ে বিচার শেষ

আশরাফ-উল-আলম   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



স্কুল ছাত্রী আদিবা হত্যা মামলার রায় হয়েছে গত ১৬ আগস্ট। নরসিংদীর অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন।

একমাত্র আসামি মিজানকে ফাঁসির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হত্যার প্রথম দায় স্বীকারকারী ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশাল সার কারখানা কলোনিতে নিজেদের বাসায় খুন হয় ঈশা খাঁ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মাইশা মাহজাবিন আদিবা। পরদিন তার বাবা মাহমুদ আলমগীর পলাশ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল।

ওই দিন দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘প্রথম দায় স্বীকারকারী আসামিই বাদ!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, মামলার পরই পাশের বাসায় বেড়াতে আসা শাহ কামালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. হেদায়েত উল্লাহ। কামাল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বলে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়। প্রতিবেদনে আদিবাকে কিভাবে হত্যা করেছে কামাল তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কিছুদিন পরে মিজানুর রহমান নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে একই ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। অভিযোগপত্রে তাঁকে দোষী উল্লেখ করা হয় এবং শাহ কামালকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, টাকা খেয়ে পুলিশ এ কাজ করেছে।

কালের কণ্ঠে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর রায় ঘোষণা স্থগিত হয়। এরপর সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে মামলার রায়ের তারিখ পড়তে থাকে। প্রথমে মামলাটি ছিল নরসিংদী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। পরে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। কয়েকজন বিচারক এ সময়ের মধ্যে বদলি হয়েছেন।

পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়নি, কেন শাহ কামাল সম্পর্কে তারা প্রতিবেদন দিয়ে বলেছিল, সে নিজেই আদিবাকে খুন করেছে। তাই মিজানুর রহমানকে মামলায় জড়ানোর বিষয়টি প্রশ্নবোধক। কামালের দায় স্বীকারের বিষয়টি অভিযোগপত্রে উল্লেখই করা হয়নি। আইনজীবীরা মনে করেন, পুলিশ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তার বিষয়টি গোপন করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাকারিয়া হায়দার বলেন, এক আসামি দোষ স্বীকার করার পরও তাকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়েছিল। এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্ত দরকার ছিল।

আসামি মিজানুরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাঁকে অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে প্রকৃত খুনিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং একজন নিরীহ ব্যক্তিকে আসামি করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। মিজানুরের বোন নুরুন্নাহার জয়া এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ভাইকে আসামি করার পর তাঁর বাবা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মা প্যারালাইজড। তাঁরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

আদিবাদের বাসা থেকে স্বর্ণালংকার চুরি করার জন্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। মিজানের ভাই হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মিজান কয়েক বছর সিঙ্গাপুরে চাকরি করে এসেছে। এর আগে আবুধাবিতে ছিল। দেশে এসে নারায়ণগঞ্জে একটি বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি নেয়। ওয়েল্ডিং ও পাইপ ফিটিংসে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। সে কেন চুরি করার জন্য একজনকে খুন করবে? এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ’

অভিযোগপত্র : পুলিশ পরিদর্শক বদরুল আলম খান গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাতে দ্বিতীয় জবানবন্দিদাতা মিজানুর রহমানকে আসামি করা হয়। প্রথম যাকে গ্রেপ্তার করা হয় সেই শাহ কামালকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হলেও পুলিশের কাছে তার দেওয়া স্বীকারোক্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি অভিযোগপত্রে।

বিচার কার্যক্রম : মামলার শুনানিতে একমাত্র আসামি মিজানুরের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয় পুলিশ, আদিবার মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজন। রায়ের জন্য প্রথম ধার্য করা তারিখের সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় পরে রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে প্রথম দায় স্বীকারকারী শাহ কামালের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বিশ্বাসই করেননি আদালত। তার ব্যাপারে পুলিশের প্রতিবেদন সম্পর্কেও কিছু বলেননি আদালত।

জোর করে স্বীকারোক্তি : ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর আসামি মিজান আদালতকে জানান, তাঁকে গ্রেপ্তারের পর দুই দিন আটকে রেখে বেদম প্রহার করা হয়। এরপর তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। তাঁর মা-বাবাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ভয়ে পুলিশের কথামতো আদালতে জবানবন্দি দেন তিনি। ম্যাজিস্ট্রেটও তাঁকে জবানবন্দি দিতে চাপ দেন বলে জানান তিনি।

নেইল কাটার প্রসঙ্গ : শাহ কামাল হত্যাকাণ্ডে নেইল কাটার ব্যবহারের কথা বলেছে বলে পুলিশ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। মিজানও নেইল কাটার ব্যবহারের কথা বলেছেন।

আপিল : ফাঁসির দণ্ডাদেশের পর মিজানের পক্ষে হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে। তাঁর আইনজীবী মুন্সী মাহবুবুর রহমান বলেন, মামলার বিষয়টি রহস্যজনক। তাঁর আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, একটি নেইল কাটার দিয়ে আদিবাকে হত্যা করা হয়। প্রথম দায়স্বীকারকারীও নেইল কাটার ব্যবহারের কথা বলেছে। মিজান পরে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাঁর স্বীকারোক্তির আগে নেইল কাটারের বিষয়টি অন্য কেউ জানবে কিভাবে? এতে প্রতীয়মান হয়, তদন্ত কর্মকর্তা জোর করে মিজানের স্বীকারোক্তি আদায় করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল বিচারিক আদালতের। আবার তদন্ত হওয়া দরকার বা পুনর্বিচার হওয়া দরকার।


মন্তব্য