kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শাসনে মরছে নদী বাড়ছে জলাবদ্ধতা

যশোরের মাথাভাঙ্গা নদী ভরাট হয়ে গেছে

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শাসনে মরছে নদী বাড়ছে জলাবদ্ধতা

শুকিয়ে যাওয়া আঠারোবেকী নদী। ছবিটি খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের বালিয়াখালী সেতুর ওপর দিয়ে হু হু করে গাড়ি ছুটে চলছে। আর সেতুর নিচে বসত গড়েছে মানুষ।

চাষ হচ্ছে ধান-সবজি-মাছ। এক সময় প্রমত্তা হামকুড়া নদীর ঢেউয়ে যেখানে নদীতীরবাসীর বুকে কাঁপন ধরত, এখন সেখানে প্রবাহের লেশমাত্র নেই। পুরো নদীটি যেন হাওয়া হয়ে গেছে।

খুলনার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এ রকম চারটি নদী একেবারে শুকিয়ে মরে গেছে, সাতটি প্রায় মরে গেছে এবং অনেকগুলো নদী মরতে বসেছে। এর ফল হিসেবে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে, বৃষ্টি হলেই দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। বর্তমানে ভবদহ অঞ্চলের মানুষ এই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একেবারে মরে যাওয়া নদী চারটি হচ্ছে—হামকুড়া, শালিখা, লাবণ্যবতী ও সাপমারা। আর প্রায় মরতে বসা সাতটি নদী হচ্ছে—হরি, আপারভদ্রা, ঘ্যাংরাইল, কপোতাক্ষ, শালতা, বেতনা ও মরিচ্চাপ।

এই অঞ্চলের বড় নদ ভৈরবের উত্তরাংশ শুকিয়ে গেছে, নিচের দিকে টিকে আছে; যার সঙ্গে এখানকার কপোতাক্ষ, বেতনা, মুক্তেশ্বরী, চিত্রা নদী, ভবদহ ও এলাকার হরিহর নদ-নদীর প্রবাহ জড়িত। আর ওই ১১টি নদীর প্রবাহ জড়িয়ে আছে কপোতাক্ষের সঙ্গে।

কিন্তু এসব নদী পলি জমে এবং মানুষের শাসনে শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। ভবদহ এলাকার অন্তত চার লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে সীমাহীন দুর্দশার মধ্যে জীবনযাপন করছে। এলাকাটি দুর্গত ঘোষণার দাবিও উঠেছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘আমরা নদীশাসন করতে গিয়ে নদী মেরে ফেলেছি। এই অঞ্চলে জালের মতো নদীগুলো এখন প্রবাহ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে বৃষ্টির পানি আটকে যায়, নিষ্কাশিত হতে পারে না; জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ’

অধ্যাপক দিলীপের মতে, ‘জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে নদীগুলোকে যতটুকু সম্ভব সচল করে তুলতে হবে; অন্যথায় আমরা বারবার জলাবদ্ধতা দুর্যোগে আক্রান্ত হব। ’

ভারত থেকে গঙ্গা নদীটি পদ্মা নাম নিয়ে রাজশাহী হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। পরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের কাছে যমুনায় মিশেছে, যা পদ্মা নামেই প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরে এসে মেঘনায় পড়েছে।

মূলত পদ্মা ও ভৈরবের শাখা ও উপনদী দিয়ে খুলনা-যশোর অঞ্চল সিক্ত।

দক্ষিণ-পশ্চিমের এলাকা ঘুরে এবং এলাকার প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে নদীশাসন এবং নদী মরে যাওয়ার বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যানুযায়ী, হামকুড়া ও আপার শোলমারী নদীটি ভবদহ এলাকার শ্রী নদী থেকে উত্পত্তি। পোল্ডার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পূর্বে আপার শোলমারীর ওপরের অংশে নদী বেঁধে ডুমুরিয়া উপজেলার শলুুয়ায় ১০ ভেন্ট (কপাট) এবং হামকুড়া নদীতে আমভিটায় ৮ ভেন্ট এবং থুকড়ার ৩ ভেন্ট স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। স্লুইসগেট থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে গিয়ে হামকুড়া নদীটি ভদ্রা নদীতে মিশেছে। বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে এলাকাবাসী দৌলতপুর-সাহাপুর সড়কের সন্ধ্যার খাল এলাকা কেটে হামকুড়ার সঙ্গে বিল ডাকাতিয়ার সংযোগ ঘটায়। এতে হামকুড়ার প্রবাহ বাড়ে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট (কে-জে ডিআরপি) বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এই কাটা অংশ বন্ধ করে দেয়। আর দুই বছরের মধ্যেই হামকুড়া শুকিয়ে একচিলতে হয়ে যায়, যা এখন সম্পূর্ণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

একইভাবে বাংলাদেশ-ভারত সীমানা বিভাজনকারী ইছামতি নদী থেকে ওঠা সাতক্ষীরার লাবণ্যবতী ও সাপমারা নদীর মুখে সু্লইসগেট করার প্রতিক্রিয়ায় পুবমুখো প্রবাহিত এই নদী দুটোর প্রবাহ কমেছে। পানি না পেয়ে এই নদী দুটো মরেই গেছে। যশোর-খুলনা রেলপথ তৈরি করতে গিয়ে মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এতে মাথাভাঙ্গার মূল স্রোত ভৈরবের পরিবর্তে কপোতাক্ষ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। আর মাথাভাঙ্গার পানি না পেয়ে ভৈরব নদটি যশোরের চৌগাছা উপজেলার তাহেরপুর থেকে যশোর শহরের বুক চিরে বাঘারপাড়া ও অভয়নগর যাওয়ার পথে শুকিয়ে যায়। ভৈরবের নিচের দিকে প্রবাহটি অভয়নগর-মজুদখালি হয়ে খুলনা শহর থেকে পুবমুখো আঠারোবেকী নামে বাগেরহাটের দড়াটানায় মিশেছে। এরপর বলেশ্বর হয়ে সাগরে পড়েছে। রূপচাঁদ সাহা খাল কাটলে ভৈরব নদের এই প্রবাহটি প্রবল বেগে দক্ষিণমুখো রূপসা-কাজিবাছা (কাচিপাতা)-পশুর হয়ে সাগরে মেশে। ফল হিসেবে আঠারোবেকী শুকিয়ে একচিলতে হয়ে কোনো রকমে টিকে আছে। আর উত্তরের চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা থেকে যশোরের চৌগাছা উপজেলার তাহেরপুর পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটারের মাথাভাঙ্গা নদীটিও ভরাট হয়ে গেছে।

কাসিমপুর ও রানাই খেয়াঘাটের মোহনা থেকে ভবদহ স্লুইসগেট পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার নদী অববাহিকাকে সাধারণত হরি অববাহিকা নামে অভিহিত করা হয়। স্থানীয় ভাষায় এ নদীকে শ্রী নদীও বলে। এটি একটি জেলা বিভাজনকারী নদী। এর পূর্ব পাশে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা এবং পশ্চিম পাশে যশোরের কেশবপুর, মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলা। ভবদহ স্লুইস গেটের ওপর থেকে শুরু করে যশোর ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত দীর্ঘ ৩২ কিলোমিটার মৃত নদীর নাম টেকা-মুক্তেশ্বরী। টেকা-মুক্তেশ্বরী নদী যশোর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভৈরব নদ থেকে শুরু হয়ে যশোর সদর, মণিরামপুর-অভয়নগর উপজেলার মধ্য দিয়ে ভবদহে এসে হরি বা শ্রী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ১৯৬৫ সালে ভবদহ স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে এ নদী মরে যায়।

ভবদহ একটি ত্রিমোহিনী। এখান থেকে শ্রী বা হরি নদী ফুলতলা উপজেলার জামিরার মধ্য দিয়ে বিল ডাকাতিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। টেকা-মুক্তেশ্বরী অববাহিকার পানিও বিল ডাকাতিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। ভবদহ এলাকায় বিল ডাকাতিয়ামুখী প্রবাহ পোল্ডার করার সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন টেকা-মুক্তেশ্বরী এলাকার সব পানিই হরি নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হয়।


মন্তব্য