kalerkantho


আদালতের নথিতে পলাতক তবু তিনি ইউপি চেয়ারম্যান

এম বদি-উজ-জামান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আদালতের নথিতে পলাতক তবু তিনি ইউপি চেয়ারম্যান

আদালতের নথিতে আড়াই বছর ধরে পলাতক বিধান বিশ্বাস। প্রতারণার একটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের।

ওই মামলার বিচারও চলছে। আগামী ২০ অক্টোবর এ মামলায় পরবর্তী তারিখ রয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯ অনুযায়ী আদালত ঘোষিত পলাতক ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য। কিন্তু গত ৭ মে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিজয়ী হন। এর পর থেকে তিনি ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল আছেন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছেন। এই চেয়ারম্যান এতই ক্ষমতাধর যে সরকারি গাছ চুরির অভিযোগে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।

ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া থানার শৌলজালিয়া গ্রামের মোকশেদ আলীর ছেলে মো. মিরাজুর রহমানকে লিবিয়ায় পাঠানোর নামে আড়াই লাখ টাকা নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে বিধান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ঢাকা মহানগর আদালতে বিচারাধীন।

নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিষয়ে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯-এর ২৬ ধারায় বিস্তারিত বলা আছে।

ওই ধারা অনুযায়ী আদালত কাউকে পলাতক ঘোষণা করলে সেই ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। যদি আদালতের এই তথ্য গোপন করে নির্বাচন করেন এবং ওই প্রার্থী বিজয়ী হন তবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নজরে আসার পর ইসি তা তদন্ত করবে। অভিযোগ পাওয়ার পর ইসি প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে (বিজয়ী) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে। এ নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পেলে ইসি গেজেট দিয়ে বিজয়ী ব্যক্তির ফল বাতিল করবে।

মামলার বাদী মিরাজুর রহমান গত রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে ২০০৯ সালে টাকা নেন বিধান বিশ্বাস। কিন্তু বিধান বিশ্বাস তাঁকে বিদেশে না পাঠিয়ে টাকা আত্মসাৎ করায় ২০১১ সালে মামলা করা হয় ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। ওই মামলায় বিধান বিশ্বাস জামিন নিয়ে প্রথম দিকে আদালতে উপস্থিত থাকলেও ২০১৪ সালের ২২ মে থেকে তিনি পলাতক। তিনি আদালতে হাজিরও হচ্ছেন না। এখন মোবাইল ফোনে মামলা তুলে নিতে বলছেন।

প্রতারণার মামলা প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান বিধান বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঝালকাঠির মিরাজুর রহমান আমার স্বাক্ষর জাল করে কয়েক বছর আগে একটি মামলা করে। এ মামলায় জামিন নেওয়ার পর কয়েকবার আদালতে হাজিরাও দিয়েছি। পরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু গত মে মাসে নির্বাচনের সময় জানতে পারি আমার বিরুদ্ধে ওই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসেছে রাজৈর থানায়। কিন্তু থানায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি গ্রেপ্তারি পোরায়ানা আসার তথ্য সঠিক নয়। ঢাকায় আদালতে খোঁজ নিয়ে মামলার নথি পাইনি। আমার মনে হয় বাদীপক্ষ নথি সরিয়ে রেখেছিল। এখন শুনতে পারতেছি মামলা রয়েছে। আমি ঢাকায় এসে আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা সম্পর্কে খোঁজখবর নেব। ’ তাঁর বিরুদ্ধে গাছ চুরির মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের বিচারপতি প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসন দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করিয়েছেন। ’

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মিরাজুরকে লিবিয়ায় পাঠানোর কথা বলে ২০০৯ সালে মতিঝিলের একটি প্রতিষ্ঠানে বসে চুক্তি করেন বিধান বিশ্বাস। স্ট্যাম্পে এ চুক্তিনামা লেখা হয়। এরপর মিরাজুর বিভিন্ন সময় বিধান বিশ্বাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (ব্র্যাক ব্যাংক) টাকা জমা দেন। এভাবে আড়াই লাখ টাকা নেন বিধান বিশ্বাস। শেষ পর্যন্ত মিরাজকে বিদেশে না পাঠানোয় মিরাজুর ২০১০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিধান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৬ ধারায় একটি প্রতারণার মামলা হয়। এ মামলায় (সিআর মামলা নম্বর-১৪৩/১১) আদালত থেকে জামিন নেন বিধান বিশ্বাস। আদালতে হাজিরাও দিতে থাকেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২২ মে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। মামলার বাদী আদালতে উপস্থিত থাকলেও বিধান বিশ্বাস অনুপস্থিত থাকেন। আদালত এক আদেশে বিধান বিশ্বাসকে পলাতক ঘোষণা করেন। জানা গেছে, এই মামলার তথ্য গোপন করে বিধান বিশ্বাস নির্বাচন কমিশনে হলফনামা দাখিল করেন এবং বৈধ প্রার্থী হিসেবে গত ৭ মে নির্বাচনে কদমবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। এরপর থেকে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিধান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি গ্রামের একটি মন্দির থেকে ১৬০ ভোল্টের সোলার প্যানেল চুরির পর তা নিজের শ্বশুরবাড়িতে স্থাপন করেন। এ ছাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন সরকারি জায়গা থেকে চারটি গাছ কেটে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। এলাকাবাসীর এসব অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর গত ৩১ আগস্ট আদালতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ওই দিন আদালতে তাঁর দেওয়া বক্তব্য নিয়ে ১ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে ‘কে ক্ষমতাধর, বিচারপতি নাকি ইউপি চেয়ারম্যান’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আরো কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অবশেষে ওই চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করে স্থানীয় প্রশাসন।


মন্তব্য