kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সন্ধ্যা নদীতে লঞ্চডুবি

একসঙ্গে আসা একসঙ্গে চিরতরে চলে যাওয়া

রফিকুল ইসলাম ও এস এম মঈনুল, বরিশাল   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



একসঙ্গে আসা একসঙ্গে চিরতরে চলে যাওয়া

মায়ের সঙ্গে যমজ ভাইবোন রাব্বি ও শান্তা। ছবি : ফাইল ফটো

রাব্বি ও শান্তা জমজ ভাইবোন। বয়স ৮ ছুঁই ছুঁই।

তারা ছিল জন্ম প্রতিবন্ধী। খাওয়া, ঘুমানো, খেলা সব একসঙ্গে। ক্ষণিকের জন্য মায়ের চোখের আড়াল হয়নি। কিন্তু বুধবার বরিশালে লঞ্চ দুর্ঘটনা তাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। একসঙ্গে জন্মেছিল ওরা, আবার একসঙ্গে চলেও গেল। তাদের এমন চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না কেউ। শুধু মা-বাবা নন, আত্মীয় থেকে শুরু করে প্রতিবেশীদের মধ্যেও চলছে শোকের মাতম।

রাব্বি ও শান্তার বাবা সিদ্দিকুর রহমান মোল্লা। সিলেট জজকোর্টে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। মা রোকসানা বেগম গৃহিণী। লঞ্চ দুর্ঘটনায় মা-বাবা প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁদের জমজ সন্তান কেড়ে নিয়েছে সন্ধ্যা নদী। ডুবে যাওয়া লঞ্চের জানালা দিয়ে ভেসে উঠতে পেরেছিলেন সিদ্দিকুর রহমান দম্পতি। কিন্তু সন্তানদের বাঁচাতে পারেননি। পরে সন্ধ্যার তীরে তাঁরা আহাজারি করতে করতে সন্তানদের খুঁজতে থাকেন। দুর্ঘটনার দিন বুধবার সন্ধ্যায় কন্যা শান্তার লাশ পান তাঁরা। আর ছেলে রাব্বির লাশ পাওয়া যায় গতকাল বৃহস্পতিবার। রাব্বির লাশ লঞ্চের সঙ্গে লেপটে ছিল। পরে লাশ ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় বানারীপাড়ার পার্শ্ববর্তী উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের মশাং গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

লাশবাহী নৌকায় বাবা সিদ্দিকুর রহমান বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘লঞ্চটির নিচতলার ইঞ্জিন রুমের পাশেই আমরা ছিলাম। লঞ্চটি যখন দাসেরহাটে পৌঁছল তখন শান্তা ওর মায়ের কোলে ঘুমাচ্ছিল। রাব্বি আমার হাত ধরে বসে ছিল। হঠাৎ লঞ্চটি কাত হয়ে ডুবে যেতে থাকে। আমি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরি। বেশ কয়েকবার দোয়া কালাম পড়ি। একইভাবে আমার স্ত্রী শান্তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই লঞ্চটি চরকির মতো সাত-আটবার পাক খায়। এ সময় ছেলে আমার হাত ফসকে বেরিয়ে যায়। ঘটনার কিছু সময় পরে আমাকে উদ্ধার করে জেলেরা। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় অর্ধকিলোমিটার দূরে একইভাবে আমার স্ত্রীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে।

এ ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা নদী থেকে মেয়ে শান্তার লাশ উদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধারকারী জাহার নির্ভীক নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধার করে। তখন লঞ্চে রাব্বির মৃতদেহ পাওয়া যায়। লাশটি মশাং গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন মা-বাবা লাশ কোলো নিয়ে বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যান।

মা রোকসানা বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘মাইয়াডা মোর কোলেই ঘুমাতেছিল। হেই খুম আর ভাঙেনি। সন্ধ্যা নদী মোর বুকের ধর নিয়ে গ্যাছে। তোরা মোর দুই সন্তানের লাশ দ্যাখতে আইছো। আল্লাহ ওদের বাঁচিয়ে রেখে আমায় নিয়ে গ্যালা না ক্যান। মুই অ্যাহোন কী নিয়া বাঁচমু। মোরো এ কোন শাস্তি দেল্যা। ’ মা রোকসানাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা ছিল না স্বজনদের।

গতকাল রাব্বি ও শান্তার দাফনের পর মা-বাবা কবরের পাশে বিলাপ করছিলেন। শোকে আক্রান্ত ছিল পুরো গ্রাম।

রাব্বি-শান্তার দাদা আয়নাল হক মোল্লা। দুটি লাশ বহন করে নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে। তিনি বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল ওরা। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা দূর করতে মঙ্গলবার নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসাসংলগ্ন নদীতে ভ্রাম্যমাণ ভাসমান জীবনতরী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিল। ওই দিন ওরা স্বরূপকাঠিতে এক খালার বাসায় ছিল। বুধবার সেখান থেকে বানারীপাড়া হয়ে লঞ্চযোগে গ্রামের বাড়ি ফিরছিল। ফিরতে গিয়েই দুর্ঘটনায় দুটি অবুঝ শিশু চলে গেল।


মন্তব্য