kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কোরবানির মৌসুমেও প্রাণহীন সাভার চামড়া শিল্পনগরী

জরিমানার নির্দেশেও ট্যানারি স্থানান্তরে মালিকদের অনাগ্রহ

তায়েফুর রহমান, সাভার   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কোরবানির মৌসুমেও প্রাণহীন সাভার চামড়া শিল্পনগরী

কোরবানির ঈদপরবর্তী সময়েও প্রাণহীন সাভার চামড়া শিল্পনগরী। কাঁচা চামড়াবোঝাই গাড়ির আনাগোনা নেই।

স্বভাবতই শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততাও চোখে পড়ে না। কারণ অধিকাংশ কারখানাই রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে এখানে স্থানান্তর করা হয়নি। উচ্চ আদালত কর্তৃক প্রতিদিন কারখানাপ্রতি ১০ হাজার টাকা জরিমানা দণ্ডের নির্দেশনা সত্ত্বেও মালিকরা সাভারে কারখানা স্থানান্তরে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

রাজধানীর হাজারীবাগের ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে কোরবানির ঈদের ছুটি শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯টি ট্যানারি সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়া এনে মজুদ করেছে। মজুদকৃত এসব চামড়া ট্যানারিগুলো পর্যায়ক্রমে প্রক্রিয়াজাত করবে। চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

সরেজমিনে গত ২০ সেপ্টেম্বর সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার বেশির ভাগ ট্যানারির অবকাঠামো নির্মাণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সেখানে খুব একটা কর্মচাঞ্চল্য নেই। চামড়া শিল্পনগরীর রাস্তাগুলোর অনেক স্থানে বৃষ্টির পানি জমে আছে। অবশ্য এখানকার সব রাস্তাঘাট এখনো পাকা হয়নি।

বিসিকের স্থানীয় অফিস ভবনটি ঘষামাজা করে নতুন করে রং করার পর কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়মিত অফিসে বসছেন। এ অফিসেই কথা হয় বিসিকের ডেপুটি ম্যানেজার মোস্তফা মজুমদারের সঙ্গে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ১৯টি ট্যানারি সাভারে তাদের কারখানায় চামড়া এনেছে। এ কারখানাগুলোর সব কটিতে এখনই চামড়া প্রক্রিয়াজাতের কাজ শুরু হয়নি। তবে শিগগিরই তা শুরু হবে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে অন্তত ৫০টি ট্যানারি তাদের কারখানা সাভারে স্থানান্তর করতে পারবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

ট্যানারিগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে মোস্তফা মজুমদার বলেন, যেসব কারখানা বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করেছে তারা পর্যায়ক্রমে সংযোগ পাবে। কয়েকটি কারখানা ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে গেছে। আর গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ট্যানারিগুলোর ক্ষেত্রে সরকারকে বিষয়টি নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে গ্যাস সংযোগ স্থানান্তর করতে সমস্যা নেই।

তবে একটি ট্যানারির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, হাজারীবাগ থেকে গ্যাসলাইন স্থানান্তর করে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে আনতে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। হাজারীবাগের কারখানাগুলো ছোট আকারের। স্বাভাবিক কারণেই সেখানে গ্যাসের চাপের মাত্রা কম হলেও কাজ চালিয়ে নেওয়া গেছে। কিন্তু সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপের মাত্রা বেশি প্রয়োজন পড়বে। সে ক্ষেত্রে কারখানাগুলো স্থানান্তর করলে বেশি মাত্রার গ্যাস অনুমোদনের একটি বিষয় রয়েছে। বেশি চাপের গ্যাস সরবরাহ পেলে সমস্যা থাকবে না।

এদিকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বিসিকের প্রস্তুতিতে এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। এ শিল্পের সবচেয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক হলো ক্রোমিয়াম মিশ্রিত পানি। এই ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এখনো বসানো হয়নি। তবে কাজ চলছে। কারখানা চালু হলে চামড়া থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন উচ্ছিষ্ট ও শক্ত বর্জ্য ফেলার ডাম্পিং ইয়ার্ডের নির্মাণকাজও হয়নি। কারখানায় ব্যবহারের জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারেনি বিসিক। তবে দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন বসানো হয়েছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও অসম্পূর্ণ।

চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক আবদুল কাইউম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পের সিইটিপির দুটি মডিউল এখন প্রস্তুত। এটা চালু করতে প্রতিদিন ১০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যের প্রয়োজন। এ জন্য অন্তত ৪৮টি ট্যানারি উৎপাদনে গেলে প্রয়োজনীয় বর্জ্য পাওয়া যাবে। কিছু কিছু ট্যানারি সাভারে এলেও এ ট্যানারিগুলোর পুরোপুরি উৎপাদনক্ষমতায় যেতে সময় লাগবে। ফলে সিইটিপি আংশিক চালু করতেও যে পরিমাণ বর্জ্য দরকার তা পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

চামড়া শিল্পনগরী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ৫৪টির ভবনের প্রথম থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত ছাদ নির্মিত হয়েছে। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলার ছাদ নির্মাণ করতে পেরেছে চারটি ট্যানারি। ৪৩টি ট্যানারি পানির মিটার স্থাপনের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে মাত্র দুটিকে পানির মিটার বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওয়েট ব্লু করার জন্য ড্রাম বসিয়েছে বা বসানোর কাজ চলছে ৫০টির। আর ড্রাম চালানোর জন্য ভারী বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে ছয়টি ট্যানারি।

প্রায় মাস তিনেক আগেই সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে রিলায়েন্স ট্যানারি চামড়া প্রক্রিয়াজাত শুরু করেছে। এরপর পর্যায়ক্রমে আজমীর, মারসন্স ও প্রিন্স, অ্যাপেক্সসহ পাঁচ-ছয়টি ট্যানারি স্বল্প পরিসরে চামড়া প্রক্রিয়াজাত শুরু করেছে।

অ্যাপেক্স ট্যানারির লেদার টেকনোলজিস্ট সৌরভ আমীন বলেন, ট্যানারি থেকে দুই ধরনের তরল বর্জ্য নির্গত হয়। একটি হলো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য, অন্যটি হলো সাধারণ বর্জ্যযুক্ত পানি। বিসিক এখনো বর্জ্য থেকে ক্রোমিয়াম আলাদা করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বসায়নি। এ কারণে অ্যাপেক্সের ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য কারখানার ড্রেনের মধ্যে জমিয়ে রাখা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে পল্লী বিদ্যুতের আলাদা বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও সেটা এখনো চালু হয়নি। প্রতিদিনই তাদের লোডশেডিংয়ের সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে তখন কিছু কাজ অব্যাহত রাখা হয়। তাদের কারখানাটিতে ৫২টি ড্রাম বসানো হবে। এর মধ্যে ৩৫টি ড্রাম বসানোর কাজ শেষ হয়েছে।

রিলায়েন্স ট্যানারির সুপারভাইজার জাকির হোসেন চৌধুরী জানান, চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় সৃষ্ট উচ্ছিষ্ট (ঝিল্লি) নিয়ে তাঁরা সমস্যায় পড়ছেন। এই ঝিল্লি এবং চামড়ার কাটিং অংশ ডাম্পিংয়ের কোনো ব্যবস্থা শিল্পনগরীতে নেই। তাই ট্রাকে ভরে এসব উচ্ছিষ্ট হাজারীবাগে নিয়ে ফেলতে হচ্ছে। এতে কারখানার খরচ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া ক্রোমিয়ামযুক্ত তরল পরিশোধনের ব্যবস্থা বিসিক এখনো চালু করতে না পারায় তাঁদের উৎপাদিত বর্জ্য কারখানার আঙিনায় গর্ত করে জমিয়ে রাখা হয়েছে।


মন্তব্য