kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইউএনও, না ‘সামন্ত রাজা’

নাসরুল আনোয়ার, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) থেকে    

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইউএনও, না ‘সামন্ত রাজা’

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ চলাকালে অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে কিশোরগঞ্জের নিকলীর রোদা নদীতে গত ২৩ জুলাই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে একটি দল ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে চড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে রোদে শুকাতে দেওয়া জাল জব্দ করে।

এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে জেলেরা ট্রলারের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে ইউএনও, ওসি ও মত্স্য কর্মকর্তাসহ কয়েকজন সামান্য আহত হন।  

ওই সময় পুলিশকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ না দিয়ে ইউএনও মো. মাহবুব আলম নিজেই তাঁর কোমর থেকে পিস্তল বের করে জেলেদের দিকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন। কেউ গুলিবিদ্ধ না হলেও ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রচার পাওয়ায় জেলাসহ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। আলোচনায় আসেন ইউএনও নিজেও। কথা ওঠে, এ যুগেও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিভাবে এমন ‘সামন্ত মনোভাব’ পোষণ করেন!

এ ঘটনার সূত্র ধরে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, নিকলীর সদ্য বিদায়ী ইউএনও মাহবুব আলম ছিলেন ‘সর্বেসর্বা’ প্রকৃতির একজন মানুষ। প্রশাসন চালাতে গিয়ে তিনি নিয়মনীতি বা বিধিবিধানের খুব একটা ধার ধারেননি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তাঁর সরকারি বাসভবনে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) চালাতেন পাশের পাওয়ার হাউসের সরকারি বিদ্যুৎ দিয়ে। অবাধে কেটেছেন উপজেলা পরিষদ চত্বরের গাছ। মূল্যবান এসব গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি করেছেন নিজের বাসার ফার্নিচার। টেন্ডার না করিয়ে তিনি নিজেই ক্যাম্পাসের সব রাস্তাঘাটের সংস্কার ও পুনর্নিমাণের কাজ করিয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্টাফ কোয়ার্টার ভবনের সংস্কারসহ চুনকামও করিয়েছেন তিনি। সরকারি খরচে নিজের গ্রামের বাড়ির জন্য বিশাল সাইজের স্টিলের গেটসহ নানা আসবাব তৈরি করে নিয়ে গেছেন। পরিষদ চত্বরের গাছে গাছে বসা মৌমাছির চাকের মধুও তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন।

নিকলীতে কর্মরত সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বলেছেন, ইউএনওর একচ্ছত্র দাপটের কাছে তাঁরা অসহায় ছিলেন। মুখ খুললেই নেমে আসত বিপদ। সামান্য কারণে তিনি বদলির হুমকি দিতেন। অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকেই ইউএনওর রোষানলে পড়েছেন। ইউএনওর চাহিদামতো মনগড়া কাজের বিল না দেওয়ায় নিকলী উপজেলা প্রকৌশলীকে বদলি পর্যন্ত করা হয়।    

নিকলীতে যোগদানের প্রায় দুই বছর পর গত মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) ইউএনও মাহবুব আলম সিলেট জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে বদলি হয়ে যান। অভিযোগ পাওয়া গেছে, দীর্ঘ প্রায় দুই বছর নিকলীতে কর্মরত থাকাকালে মর্জিমাফিক প্রশাসন চালিয়েছেন তিনি। এ কারণে উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এত দিন গতিশীলতা পায়নি। একই কারণে প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ ও ফাঁকিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এত দিন প্রশ্রয় পেয়েছেন। তবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগই স্বীকার করেননি।

ইউএনও যখন ঠিকাদার : উপজেলা পরিষদের ক্যাম্পাসের ভেতরের ২২২ ফিট (প্রায় সাড়ে ২২ মিটার) রাস্তা মেরামত, একই দৈর্ঘ্যের প্রতিরক্ষা দেয়াল (গাইড ওয়াল) নির্মাণ ও আরসিসি রাস্তা নির্মাণের কাজ করেন ইউএনও নিজেই। তিন ভাগে করা এ কাজের মোট বরাদ্দ ছিল তিন লাখ টাকা। এলজিইডি জানায়, দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান ছাড়া দুই লাখের বেশি টাকা খরচের বিধান না থাকায় তিনি একটি কাজকে তিন ভাগে বিভিন্ন নামে ভাগ করে সম্পন্ন করেন। জানা যায়, অনিয়মের সুবিধার জন্য একটি কাজকেই তিনটি আলাদা নামে করেন।

এ ছাড়া ইউএনও নিজেই উপজেলা ক্যাম্পাসের নন-গেজেটেড স্টাফ কোয়ার্টার ‘ধনু’ ভবন মেরামতের নামে দেড় লাখ টাকার ‘নিজস্ব’ প্রকল্প প্রণয়ন করেন। সূত্রগুলো জানায়, ভবনের খসে পড়া অংশে পলেস্তারা, ভাঙা দরজা-জানালা মেরামত ও রঙের কাজ করার কথা। কিন্তু ইউএনও ওই ভবনের আস্তর ও দরজা-জানালা মেরামত না করেই নামমাত্র রং করে তাঁর প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেন। স্থানীয় লোকজনের অভিমত, এ কাজের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচের সুযোগ নেই।

উপজেলা পরিষদ চত্বরের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও বর্ধিতকরণের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় ও এলজিইডি মন্ত্রণালয়ের যৌথ অনুমোদন বাধ্যতামূলক। নিকলীর সদ্য সাবেক ইউএনও সীমানাপ্রাচীর বর্ধিত করার লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদের বৈঠকে নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব অনুমোদন করিয়ে রেখেছিলেন। সূত্র মতে, অর্ধবরাদ্দ সাপেক্ষে তিনি এ কাজ বাস্তবায়ন করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি উচ্চপর্যায়ের কোনোরূপ অনুমোদন নেননি।

এদিকে বিদায়ী ইউএনও মাহবুব আলম উপজেলা পরিষদের একটি পুকুরের চারপাশের পাড় সিসি ব্লক দিয়ে ঢেকে দেওয়ার একটি আজগুবি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করেন। নিকলীর বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সরকারি একাধিক কর্মকর্তা জানান, জমির দলিল নিবন্ধন থেকে ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নের জন্য ‘ওয়ান পার্সেন্ট’ টাকা জমা হয়। জানা যায়, নিকলীর ইউএনও নিকলীর সাতটি ইউনিয়নে পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পুকুরপাড় সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধাইয়ের জন্য এক লাখ করে টাকা নেন। পরে ইউএনও নিজেই সাড়ে ছয় লাখ টাকার মনগড়া প্রকল্প তৈরি করে নিজ দায়িত্বে পুকুরপাড় বাঁধাই করেন।

ইউএনও এক বছরের বেশি সময় নিকলীর সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সে সুবাদেও তিনি এসি ল্যান্ড কার্যালয় মেরামত ও রঙের কাজ করিয়ে সেখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন।

সদ্য বিদায়ী ইউএনও মাহবুব আলম বলেন, তিনি নিজে এসব কাজ করাননি। প্রকল্প কমিটির মাধ্যমেই করিয়েছেন। এসি ল্যান্ড অফিস সংস্কার কাজের কথিত প্রকল্প কমিটির সভাপতি ছিলেন নিকলী সদর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য তাজুল ইসলাম শিপন। তিনি জানান, ইউএনও তাঁর ওয়ার্ডভুক্ত এ কাজের জন্য তাঁকে সভাপতি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কাজ করিয়েছেন ইউএনও নিজেই। তাঁর ভাষ্য, ‘ইউএনও স্যার চাইলে আমাদের (মেম্বারদের) সভাপতি হতে হয়। পরে মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করে আমরা খালাস পাই। কী কাজ হলো বা আদৌ কিছু কাজ হলো কি না তা জানার সুযোগ হয় না। ’    

নিকলীর তত্কালীন উপজেলা প্রকৌশলী আবুল হাসানাত মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে জানান, নিকলীর সাবেক ইউএনও অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে প্রচুর অবৈধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে গেছেন। এভাবে তিনি সরকারের বহু টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তাঁর সেসব কর্মকাণ্ডে সায় না দেওয়ায় স্বার্থান্বেষী মহলের মাধ্যমে ইউএনও তাঁকে জুন ক্লোজিংয়ের আগেই বদলি করিয়েছেন।

অবাধে গাছ কর্তন : ইউএনও মাহবুব আলম উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে দীর্ঘ দুই বছরে মূল্যবান ২০-২৫টি গাছ কেটে ফেলেন। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, এর মধ্যে রয়েছে মেহগনি, শিশু, রেইনট্রি, নিম, আকাশমনি প্রভৃতি। এ ছাড়া তিনি বেশ কিছু মৃতপ্রায় আমগাছ কেটেও বিক্রি করেন বলে জানা গেছে।

সরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যথাযথ অনুমোদন লাগে। জাতীয় দৈনিকে দরপত্র (টেন্ডার) বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালাতে হয়। এরপর গাছ বিক্রির জন্য প্রকাশ্যে নিলাম ডাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু নিকলীর সাবেক ইউএনও বিধিবিধানের সামান্য তোয়াক্কা না করেই দিনের পর দিন অবাধে মূল্যবান সব সরকারি গাছ বিক্রি করেছেন। এমনকি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্য সেসব গাছের কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করেছেন।

মধু বিক্রির টাকার হদিস নেই : হাওরপারে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত নিকলী উপজেলা পরিষদ চত্বর। বিশাল চত্বরজুড়ে আমবাগান করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে আম, কাঁঠাল, জামসহ শতাধিক পুরনো গাছও। ফিবছর শীত মৌসুমে বহু গাছে বাসা বাঁধে মৌমাছি। এসব মৌমাছির চাক থেকে প্রতিবছরই কয়েক মণ মধু আহরণ করা হয়।

উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, বিগত শীত মৌসুমে আহরিত হয় কমপক্ষে তিন মণ মধু; যার বাজারমূল্য কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এর আগে উপজেলা কমপ্লেক্সে বসবাসরতদের মধ্যে মধু, আমসহ নানাজাতের ফলমূল বিলিবণ্টন করা হতো। কিন্তু ইউএনও মাহবুব আলম সেই রেওয়াজ ভেঙে দিয়ে সব মধু বিক্রি করে দেন।

মধু বিক্রি প্রসঙ্গে সাবেক ইউএনও বলেন, মধু বিক্রি হয়নি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।

নিকলীতে তাঁর প্রায় দুই বছরের কর্মজীবন ছিল বিলাসবহুল। অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতেন। নিজেই গাড়ি চালিয়ে গ্রামের বাড়ি যেতেন। নদী থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও তিনি বালু উত্তোলনের মৌখিক অনুমতি দিয়ে উেকাচ গ্রহণ করতেন। সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করার সময় বিশেষ করে জমাজমির খারিজ করার অনুমতি দিয়ে তিনি প্রচুর বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

জমির খারিজ করাতে গিয়ে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও সাবেক ইউএনও মাহবুব আলম স্বীকার করেননি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের বিস্তর প্রমাণ থাকার কথা জানালে তিনি নিরুত্তর থাকেন।

মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) বাজিতপুরের ইউএনও এ জেড এম শারজিল হাসান নিকলীর ইউএনওর অতিরিক্ত দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইউএনওদের এসি চালানোর রেওয়াজ নেই। তবে কেউ (কোনো ইউএনও) সরকারি বাসায় এসি চালাতে চাইলে ব্যক্তিগত খরচে চালাতে পারেন।


মন্তব্য