kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বেহাল ঢাকা জেলা রেকর্ড রুম

আপেল মাহমুদ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বেহাল ঢাকা জেলা রেকর্ড রুম

ঢাকা জেলা রেকর্ড রুমের অবস্থা করুণ। দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবরেজিস্ট্রার গুরুতর অসুস্থ।

বিছানায় শুয়ে দাপ্তরিক কাজ করেন। তিনি এতটাই অসুস্থ যে এক মুহূর্তও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেন না। দলিলে সই করার সামর্থ্যও তাঁর নেই।

কেউ হাত ধরে সহযোগিতা করলে সই করেন সাবরেজিস্ট্রার। এ জন্য দুজন উমেদার রয়েছেন। তাঁরা তাঁকে নিচতলা-দোতলায় ওঠানামার সাহায্যও করেন। প্রায় দেড় বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। এ সুযোগে উমেদার-পিওনরা যা ইচ্ছা তা-ই করছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বেশ কয়েক বার। কিন্তু তারা নির্বিকার।

কয়েকজন দলিল লেখক জানান, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রুম অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। চরম অব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে। লাখ লাখ বালাম বই, সূচি বই ও থাম বইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে জালিয়াতচক্র বালাম বইয়ের পাতা ছিঁড়ে বা জমির পরিমাণে কারসাজি করে কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের জমি আত্মসাৎ করেছে।

কিছুদিন আগে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লটের বালাম বই ও সূচি বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এ কাজ করার জন্য রেকর্ড রুমে নিয়োজিত পিওন ও উমেদাররা এক কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছে বলে দলিল লেখকরা অভিযোগ করেন।

সম্প্রতি ঢাকা জেলা রেকর্ড রুমে গিয়ে দেখা গেল, এর তত্ত্বাবধায়ক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল ইসলাম তালুকদার প্রায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন। কয়েক বার তাঁকে নাম ধরে ডাকলেও তিনি জবাব দেননি। একজন উমেদার এগিয়ে এসে বলেন, ‘তিনি অসুস্থ। চোখে দেখেন না, কানেও কম শুনেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যার কারণে তিনি একা চলাফেরা করতে পারেন না। কথা বলা দূরের কথা, তিনি কাউকে চিনতেই পারেন না। তাঁর পরিবর্তে আমরা কাজ করছি। বলুন, কী কাজে এসেছেন। ’ এরপর সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি কৌশলে সেখান থেকে সরে পড়েন।

দেখা গেল, রেকর্ড রুমে টাউট-দালালদের রাজত্ব চলছে। ১৩ জন উমেদার তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের দৃশ্যও দেখা গেল।

আশুলিয়ার আলী আকবর ফকির বলেন, ‘দুই মাস ধরে একটি নকলের জন্য ঘুরছি। একজন উমেদার এক সপ্তাহের মধ্যে দলিলের নকল দেবেন বলে আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখন দলিলও দিচ্ছেন না, টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযোগ করতে গেলে তাঁরা বলেন, ‘আপনি সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রারের কাছে যান। সাবরেজিস্ট্রারের কাছে এসে দেখি, তিনি অসুস্থ। কারো সঙ্গে কথা বলতে পারেন না তিনি। ’

বাংলাদেশ নকলনবিশ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রেকর্ড রুম সাবরেজিস্ট্রার অসুস্থ। রুমটি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। সেখানে কর্মরত উমেদার ও পিওনরা যা ইচ্ছা তা-ই করছেন। সেখানে এখন কোনো রেকর্ড কিপার নেই। জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের একজন টাইপিস্ট রেকর্ড কিপারের কাজ করছেন। এসব কারণে মূল্যবান বালাম বই নষ্ট হতে পারে, জালিয়াতির ঘটনা ঘটতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন ক্ষতি হতে পারে, যা তারা কোনো দিন পূরণ করতে পারবে না। ’

জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল জলিল বলেন, ‘রেকর্ড রুম নিয়ে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন। আমি এখানে যোগদানের পর বেশ কয়েকটি চিঠি লিখে রেকর্ড রুমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আবেদন করেছি। এখনো স্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর অনুমোদন পাইনি। ফলে বহিরাগত উমেদারদের দিয়ে কাজ করাতে বাধ্য হচ্ছি। ’ তিনি জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবরেজিস্ট্রার অসুস্থ অবস্থায় অনেক দিন ধরে অফিস করছেন। তাঁর জায়গায় একজনকে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি যোগদান করেননি। ফলে বিছানায় শুয়েই বর্তমান সাবরেজিস্ট্রারকে কাজ করতে হচ্ছে। ’

বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির মহাসচিব এম এ রশিদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল ইসলাম বাহাদুর জানান, ‘দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রুম এটি। কয়েক শ বছরের পুরনো দলিলের বালাম বই রয়েছে সেখানে। সেসব বই ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে, বিভিন্ন জালিয়াতচক্রকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। বহিরাগত উমেদাররা মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে বালাম বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলছেন। অনেকের সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কেনা সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বালাম বই ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ প্রায়ই আমরা পাচ্ছি। ’

বহিরাগত কোনো ব্যক্তির সরকারি দপ্তরে কাজ করতে পারার কথা নয়। কিন্তু ঢাকা জেলা রেকর্ড রুম তাদের হাতে জিম্মি। বর্তমানে সেখানে ১৩ জন উমেদার কাজ করছেন। তাঁরা মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে কাজ করছেন বলে একাধিক উমেদার জানান।

পরিদর্শনের সময় ইসমাইল, মোমেন, হায়াত নামের তিনজন উমেদারকে লোকজনের সঙ্গে ঘুষের অঙ্ক নিয়ে দরকষাকষি করতে দেখা গেল। জিজ্ঞেস করলে তাঁরা জানান, দলিলের নকলপিছু আড়াই শ থেকে তিন শ টাকা ঘুষ দিতে হয় জেলা রেজিস্ট্রার, রেকর্ড রুম সাবরেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের কেরানিকে। মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা না নিলে সবাইকে সামাল দেওয়া যাবে না।

কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রার বলেন, দ্রুত ঢাকা জেলা রেকর্ড রুমের অব্যবস্থা দূর করা দরকার। না হলে এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। বালাম বইয়ের পাতা ছেঁড়ার প্রচুর অভিযোগ আসছে। এটা বন্ধ না হলে ঢাকায় ব্যাপক সমস্যা দেখা দিতে পারে।


মন্তব্য