kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আইএমইডির প্রতিবেদন

তিন বছর না যেতেই বেহাল বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক

আরিফুর রহমান   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তিন বছর না যেতেই বেহাল বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক

গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেও তা করে যেতে পারেননি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১৩ সালের শেষের দিকে গাজীপুরের শ্রীপুরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’ উদ্বোধন করেন তিনি। দ্রুতই সেটি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে বছর তিনেক না যেতেই পার্কের বেশির ভাগ অবকাঠামো বেহাল ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূর-দূরান্ত থেকে যারা উন্মুক্ত অবস্থায় বাঘ, সিংহ, হরিণ দেখতে সাফারি পার্কে যায়, তাদের জন্য পার্কের ভেতর নির্মাণ করা ‘বন বিলাস’ নামের দুটি ইকো-কটেজের দেয়ালে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ফাটল ধরেছে। ‘ময়ূরী’ নামের আরেকটি ইকো-কটেজেও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দরজা ও বাথরুমে ব্যবহৃত কাঠও নিম্নমানের। বাঘ-সিংহ দেখতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য পার্কের ভেতরে এক কোটি টাকা ব্যয়ে যে দুটি রেস্তোরাঁ নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোও আড়াই বছরের ব্যবধানে জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। জরুরি ভিত্তিতে সেগুলোর সংস্কার দরকার।

সাফারি পার্কটিতে বর্তমানে তিন হাজার ৮১৩ প্রজাতির বন্য প্রাণী আছে। আইএমইডি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিয়ে বাস্তবায়ন করায় নিম্নমানের কাজ হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্কের ভেতর নির্মাণ করা ঝুলন্ত সেতুটি খুবই সরু। মূল নকশার আলোকে সেটি করা হয়নি। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া সাফারি পার্কের প্রধান আকর্ষণ যেসব বন্য প্রাণী, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ কিংবা চিকিৎসক নেই। ফলে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী মারা যাচ্ছে। তবে তাদের মৃত্যুর কারণ বলতে পারছে না কেউ। তাই পরবর্তী করণীয়ও ঠিক করা যাচ্ছে না।

আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এ পার্কে জিরাফ, হরিণ, বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির বেশ কয়েকটি বন্য প্রাণী মারা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা চারটি জিরাফের মধ্যে গত বছর একটি মারা যায়। আগের বছর সুন্দরবন থেকে আনা রয়েল বেঙ্গল টাইগারটিকেও বাঁচাতে পারেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ। জিরাফটি কী রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, তা নির্ণয় করতে পারেনি কেউ।

প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে আইএমইডি থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পরামর্শক লস্কর মাকসুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্কের ভেতরে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়া হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে। অবশ্য কর্তৃপক্ষ বলেছে, বাজেট কম ছিল। এ ধরনের বড় কাজ গণপূর্ত কিংবা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দিয়ে করালে ভালো হতো। তবে পার্ক কর্তৃপক্ষ সেই পথে হাঁটেনি। ’

মাকসুদুর রহমান আরো বলেন, সাফারি পার্কে প্রধান আকর্ষণই হলো এর ভেতরের বন্য প্রাণী। কিন্তু এসব প্রাণী তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত জনবল ও বিশেষজ্ঞ নেই। এ কারণে পার্কে প্রতিনিয়তই প্রাণী মারা যাচ্ছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাফারি পার্কের ভেতর যেসব জলাধার নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা, সেগুলো এখনো শেষ হয়নি। জলাধার যে মাপের হওয়ার কথা এবং যতটুকু গভীরতা থাকার কথা, সেভাবে করা হয়নি। পার্কে যাওয়ার যে দুটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোও নিম্নমানের। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে গেছে। ফলে পার্কে যেতে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

পার্কে ঢোকার পথে এবং বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। সেটি নির্মাণেও কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিকৃতিটি লাইফ সাইজের পরিবর্তে টাইলস দিয়ে করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।  

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দর্শনার্থীদের চাহিদার সঙ্গে তুলনা করলে পার্কে বন্য প্রাণী কম। দিন দিন প্রাণীর সংখ্যা কমছে। তাদের স্বাস্থ্যসেবাও অপর্যাপ্ত। বন্য প্রাণী ও তাদের স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।

আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো সাফারি পার্কের চারদিকে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় অবৈধভাবে গাছ কাটা ঠেকানো যাচ্ছে না। পার্কে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটছে। বন্য প্রাণীর চলাফেরার জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি।   

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’ প্রকল্পটির মেয়াদ এ পর্যন্ত তিনবার বাড়ানো হয়েছে। ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০১০ সালের ১১ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়। ব্যয় ধরা হয় ৬৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালের মধ্যে পার্কের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন না করা ও বিদেশ থেকে বন্য প্রাণী আমদানি জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি বন অধিদপ্তর। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২২০ কোটি টাকা। সর্বশেষ এর ব্যয় ৩২৫ কোটি টাকা করা হয়েছে, মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।   প্রকল্পে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২২৩ কোটি টাকা।


মন্তব্য