kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যাত্রী-মালিক কেউই মানছেন না প্রশাসনের কথা

ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ যাত্রী টানছে বরিশালের লঞ্চগুলো

মঈনুল ইসলাম সবুজ, বরিশাল   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বরিশাল নৌবন্দর ভবনের দ্বিতীয় তলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে দুপুর ১টা থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে উঠবেন না। সুরভী-৭, ৮ ও ৯, সুন্দরবন-১০ ও ৭ এবং পারাবত-১২, ও ১১ তৃতীয় তলার হুইল রুমের (মাস্টার কক্ষ) সামনে যাত্রীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে।

ওই সব স্থানে যাত্রী ওঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দয়া করে সংরক্ষিত এলাকা থেকে যাত্রী নামিয়ে দিন। তা না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

বৃথাই এ ঘোষণা। কে শোনে কার কথা। বরং ওই লঞ্চগুলোর খালাসিরা (লঞ্চ শ্রমিক) ‘জায়গা খালি আছে’ স্লোগান দিয়ে যাত্রীদের লঞ্চে ওঠাচ্ছে। দুপুর ১টার মধ্যে বরিশাল ঘাটে নোঙর করা সব লঞ্চই যাত্রীতে টইটম্বুর হয়ে গেলে সমানতালে যাত্রী ওঠাচ্ছে লঞ্চ ছাড়ার আগ পর্যন্ত। গতকাল শনিবার বরিশাল লঞ্চঘাটে গিয়ে এ চিত্র দেখা গেছে।

ঈদুল আজহা, অতিরিক্ত ও সাপ্তাহিক মিলে ৯ দিন ছুটি শেষে পরিবার-পরিজন নিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ গতকাল শনিবার কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী দুই-তিন দিন লঞ্চে ভিড় হবে। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা ঈদের আগে কম ছুটি পেয়েছে। তাদের বড় অংশ অতিরিক্ত ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে আরো দুই-তিন দিন সময় লাগবে।

গতকাল শনিবার লঞ্চঘাট এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বরিশাল থেকে ১৯টি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। কীর্তনখোলা ১ ও ২, দ্বীপরাজ, কালাম খান-১, টিপু-৭, ফারহান-৮, সুন্দরবন-৭ ও ১০, পারাবত-৯, ১০, ১১ ও ১২ এবং সুরভী-৮ ও ৯ লঞ্চের কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না দুপুরেই। যাত্রীরা লঞ্চের ছাদে, কেবিনের আশপাশে এমনকি কার্নিসের ওপর কোনো রকমে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে গন্তব্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। প্রতিটি লঞ্চই ধারণক্ষমতার পাঁচ থেকে সাতগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওনা হয়। নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা আগেই অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এসব নৌযান বরিশাল নৌবন্দর ত্যাগ করে। তবে নৌবন্দরের দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট ও নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত লোড সাইন অতিক্রম করার আগেই লঞ্চগুলোকে নৌবন্দর ত্যাগ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রীবাহী লঞ্চ মালিক সমিতির বরিশাল জেলা শাখার সদস্য শহীদুল ইসলাম পিন্টুু বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে না ওঠার জন্য আমরাও যাত্রীদের নিষেধ করছি। এ ছাড়া বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে। এ ছাড়া নৌ পুলিশ সদস্যরা ঘাটে উপস্থিত হয়ে যাত্রীদেরও বারণ করছে। কিন্তু যাত্রীরা কোনো বাধা মানছে না। ঈদ-কোরবানির ছুটিগুলোতে যাত্রীদের চাপ বেশি থাকায় অনেক সময়ে যাত্রীদের সামাল দেওয়া কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বলে জানান তিনি।

সুরভী-৯ লঞ্চের যাত্রী জামান হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ভাণ্ডারিয়া থেকে দুপুর দেড়টায় লঞ্চঘাটে এসে দেখি সব লঞ্চই যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। কেবিন বয়দের অনুরোধ করে করিডরে চাদর বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছি। যে জায়গাটুকু পেয়েছি তা একজনের। আর এতেই পরিবারের ছয় সদস্য বসে যেতে হবে। আজ (শনিবার) ছুটি শেষ হয়েছে আগামীকাল কাজে যোগ দিতে হবে।

পারাবত-১০ লঞ্চের কেবিনের যাত্রী রাকিবুল হাসান বলেন, অতিরিক্ত পয়সা দিয়ে কেবিনে যাই ঝামেলামুক্ত থাকার জন্য। কিন্তু লঞ্চ কর্তৃপক্ষ কেবিনের লবিগুলোও ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। একবার কক্ষে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। অবস্থা এমন যে টয়লেট ব্যবহার পর্যন্ত করা যায় না। কারণ টয়লেটের সামনেও যাত্রী থাকে।

বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঈদের পরে আজই (গতকাল শনিবার) যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি। তাই যাত্রী বহনের জন্য গতকাল বরিশাল টার্মিনাল থেকে ১৯টিসহ ভায়া রুটে ২৪টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। এ ছাড়া সরকারি দুটি ও দিবা সার্ভিসের আরো দুটি জাহাজ বরিশাল থেকে ছেড়ে গেছে। লঞ্চগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, কে শোনে কার কথা। অতিরিক্ত যাত্রী ওঠাতে আমরা বারবার লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে চাপ দিচ্ছি। কর্তৃপক্ষ তা মানছে না। আবার যাত্রীরাও শুনছে না। তার পরেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসে অভিযান চালিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার মধ্যে সব লঞ্চ ঘাট ছাড়তে বাধ্য করেছে।

নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোতালেব হোসেন বলেন, ঢাকামুখী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব প্রস্তুতি আগে থেকে নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য নৌবন্দরের প্রবেশদ্বারগুলোতে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। সন্দেহভাজনদের দেহ ও ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে। নৌবন্দরের টার্মিনালজুড়ে আনসার বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। নৌ পুলিশের সদস্যরা নদীতে টহল দিচ্ছে।

যাত্রীদের সহযোগিতার জন্য এদিকে স্কাউট, মেডিক্যাল টিম ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদেরও টার্মিনাল এলাকায় সক্রিয় অবস্থানে দেখা গেছে। লঞ্চগুলো যাতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে না পারে সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশের সহযোগিতায় লঞ্চগুলো নজরদারিতে রাখছেন। তার পরও মালিকরা লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছেন। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে না ওঠার জন্য অনুরোধ করা হলেও যাত্রীরা তা শুনছে না।


মন্তব্য