kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শ্যামনগর থানার ওসি ক্লোজড

সাতক্ষীরায় ছাত্রলীগ-পুলিশের হাতে নারী চিকিৎসক লাঞ্ছিত

ওমর ফারুক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় এক নারী চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করেছে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পুলিশও মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে আটক করে হয়রানি করেছে।

পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হককে ক্লোজড করা হয়েছে।

ওই চিকিৎসকের নাম শম্পা রানী। তিনি শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও (রেসিডেনশিয়াল মেডিক্যাল অফিসার)। তাঁকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় সারা দেশে চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে চিকিৎসক নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, নাটক সাজিয়ে পুলিশ একজন নারী চিকিৎসককে হেয়প্রতিপন্ন করেছে। এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের উপযুক্ত বিচার চান তাঁরা। দোষীদের বিচার চেয়ে গত রবিবার খুলনায় বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন খুলনা বিএমএর (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন) নেতারা। চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও জানানো হয়েছে। তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।  

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, গত ২৮ আগস্ট দুপুরে তাহেরা খাতুন (৪) নামের এক শিশুকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তার পেটে নাড়ি জড়ানো ছিল। জরুরি বিভাগের ডা. দীপংকর মণ্ডল শিশুটিকে একটি স্যালাইন লাগিয়ে ওপরের বেডে পাঠিয়ে দেন। কিছু সময় পর বমি করায় ডাক্তার শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এর আগে তার এক্স-রে করানোর পরামর্শ দেন তিনি। এক্স-রে করার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে শিশুটি মারা যায়। পরে দায়িত্ব পালন করতে এসে ডা. শম্পা রানী ডেথ সার্টিফিকেট লেখার প্রস্তুতি নিতেই তাঁর ওপর হামলা চালান স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। তাঁদের অভিযোগ, শিশুটি চিকিৎসকের অবহেলায় মারা গেছে।

শম্পা রানী সাংবাদিকদের জানান, তিনি ওই রোগী সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না, তার ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করছিলেন মাত্র। এ সময় ওই রোগীর পক্ষ নিয়ে শ্যামনগর মহসীন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুস সবুর ও রহমতের নেতৃত্বে ছয়-সাতজন যুবক তাঁকে চড়-ঘুষি মারেন এবং টানাহেঁচড়া করেন। এ ঘটনায় তিনি ছাত্রলীগ নেতা সবুর, রহমতসহ তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ছয়-সাতজনের বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ ছাত্রলীগ নেতা জয় মণ্ডল, আবদুস সবুর ও রহমতকে গ্রেপ্তার করে।

এ ঘটনার পর তিনি (শম্পা) খুলনায় চলে যান। সেখান থেকে গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে শ্যামনগরে ফেরেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁর বাবা তাঁকে নিজের বাসায় না নিয়ে স্থানীয় মা ও শিশু স্বাস্থ্য প্রকল্পের কোয়ালিটি ম্যানেজার আরিফুজ্জামান পলাশের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখান থেকে ওই রাতেই অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে পলাশ ও তাঁকে (শম্পা) আটক করে থানায় নিয়ে যায় শ্যামনগর থানার পুলিশ। পরে রাতে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) যুগ্ম সম্পাদক ডা. জুলফিকার আলী লেনিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত শনিবার আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছি। আমরা বলেছি, ডাক্তাররা ইনসিকিউরড হলে কী করে দায়িত্ব পালন করবেন? এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। ওসি নাটক সাজিয়ে একজন নারী চিকিৎসককে হেয় করেছেন। ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছি। ’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যে দোষী বলে প্রমাণিত হবে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

শ্যামনগর থানার ওসি এনামুল হক ক্লোজড হওয়ার আগে গত রবিবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে জানান, শম্পা রানীর সঙ্গে পলাশের অবৈধ মেলামেশা চলছে। এ খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই। দরজা বন্ধ দেখতে পেয়ে ডাকাডাকি করি। পরে পলাশ দরজা খুলে দিলে তাঁদের অসামাজিক কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ডা. শম্পা ও পলাশকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মুচলেখা নিয়ে রাতেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় একটি জিডি করেছি। পুরো ঘটনাটি এসপি স্যার ও এএসপি সার্কেল স্যারকে অবগত করা হয়েছে। ’ সাতক্ষীরার সার্কেল এএসপি সালাহউদ্দিন বলেন, সেদিন পুলিশ যাওয়ায় ঘটনাস্থলে অনেক লোক জড়ো হয়েছিল। এ অবস্থায় ওই চিকিৎসকের নিরাপত্তার জন্যই তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়।


মন্তব্য