kalerkantho


বাজিতপুর

ফুদুর অপরাধনামা

নিজস্ব প্রতিবেদক, হাওরাঞ্চল   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফুদুর অপরাধনামা

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে দড়িঘাগটিয়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী ফুদুর আলীর এই বাড়িটি ছিল তার এক নম্বর ‘টর্চার সেল’। এ বাড়িতেই লোকজনকে এনে অত্যাচার, এমনকি খুনও করা হতো। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার পর কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের ফুদুর আলী ওরফে রিপনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। সাত-আট বছর ধরে ফুদুর ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক।

একসময়ের ছিঁচকে চোর ফুদুর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তিন জেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতেন।

পুলিশ বলছে, ফুদুর আলী ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার খুনি। কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিগত কয়েক বছরে যে কয়টি গুম-খুন ঘটে, এর অধিকাংশ ঘটায় ফুদুর ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী। এ ছাড়া ডাকাতি, রাহাজানি, গরু লুট, চুরি, ছিনতাই, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করত তাঁর বাহিনী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুদুরের শ্যালক মোহনসহ বাহিনীর অর্ধশত সন্ত্রাসী তিন জেলায় সক্রিয় রয়েছে। পুলিশ জানায়, তাঁর বর্তমান স্ত্রী অঞ্জনা, শ্বশুরবাড়ির এলাকার সুরুজ আলীর স্ত্রী রহিমাসহ বেশ কয়েকজন নারী সদস্য এ বাহিনীর হয়ে কাজ করে। এমনকি ফুদুরের শ্বশুর নান্নু মিয়া সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। ফুদুর বাহিনীর অন্তত তিনটি টর্চার সেলের খোঁজ পেয়েছে পুলিশ। এলাকাবাসী জানায়, ফুদুরের অবর্তমানে অঞ্জনা বাহিনীর সন্ত্রাসীদের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন।

ফুদুর তাঁর নিজ বাড়ির টর্চার সেলে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল মুক্তা নামে এক নারীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর আট টুকরা করে পাশের ডোবায় পুঁতে রাখেন।

গতকাল রবিবার দুপুরে দড়িঘাগটিয়ায় ফুদুর আলীর নিজ বাড়ি তথা টর্চার সেলের খোঁজে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির বাইরের দেয়াল টাইলস করা। তবে বাড়িটি তালাবদ্ধ। গ্রামবাসী জানায়, এ বাড়িতে বহু নিরপরাধ মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন ফুদুর। ২০১২ সালে বিরোধের সূত্র ধরে ফুদুর ওই গ্রামের গাছ ব্যবসায়ী নাজনু মিয়াকে জবাই করার পর লাশ ডোবায় ফেলে রাখেন। গতকাল নাজনুর বাড়িতে গেলে তাঁর স্ত্রী মোছা. আনোয়ারা বলেন, ‘সারা গ্রামের মানুষ ফুদুরের মৃত্যুতে খুশি। কিন্তু আমি খুশি হতে পারছি না। এর কারণ, ফুদুর সারা জীবনের জন্য আমার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। ’

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গত ৯ জুলাই বাজিতপুরের বলিয়ারদী ইউনিয়নের সাগরফেনা গ্রামের পাশে ঘোড়াউত্রা নদীতে গলাকাটা ও বুকচেরা এক যুবকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। গোপনে খবর মেলে, ফুদুর তাঁর শ্বশুর নান্নুর বাড়িতেই এ যুবকের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন। পরে পুলিশের দল নান্নুর বাড়িতে গিয়ে বেশ কয়েকটি চোরাই মোবাইল ফোন, বাক্সভর্তি শতাধিক চাবি, বাচ্চাদের সাইকেল, নতুন কাপড় থেকে শুরু করে বহু মালামাল পায়। এ ছাড়া সিলেটের একটি প্রাইভেট কারের নম্বর প্লেটও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।

বাজিতপুর থানার এসআই গোলাম কিবরিয়া জানান, সিলেটে প্রাইভেট কার ছিনতাইয়ের সঙ্গে ফুদুর জড়িত। তা ছাড়া বাক্সভর্তি চাবি দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও বাসাবাড়ির তালা খুলত ফুদুর বাহিনী।

সরেজমিন সাদিরচর ঘুরে জানা গেছে, ফুদুর আলী তাঁর ভাগে পাওয়া ডাকাতি ও লুটের মালামালের একটি অংশ শ্বশুরের মাধ্যমে বিক্রি করতেন। চুরি বা লুটের গরু তাঁর শ্বশুর বিক্রি করতেন। সর্বশেষ নান্নু মিয়ার বাড়িতে লুটের তিনটি গরু রাখা ছিল। ফুদুর বেলাবতে ধরা পড়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর নান্নু মিয়ার বাড়ি থেকে গরু তিনটি সরিয়ে অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে। এদিকে বন্দুকযুদ্ধে ফুদুর নিহত হওয়ার পরদিন শুক্রবার তাঁর স্ত্রী বেলাবর বাসা থেকে ট্রাকে করে সব মালামাল নিয়ে এসেছেন।

এর আগে গত ৮ মে কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানায় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর জিহ্বা ও দুই পায়ের রগ কাটা ছিল এবং কাটা স্থান কাপড় দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় খুনিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্তে প্রকাশ পায়, ফুদুর আলী তাঁর নারী সহযোগী রহিমার বাড়িতে এ যুবককে পিটিয়ে অচেতন করে।

কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্র জানায়, হতভাগ্য এ যুবকের নাম জমিরউদ্দিন (৩৫)। তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার রাজাপুর গ্রামে। ফুদুর আলী তাঁকে অচেতন করে হত্যার পর কুলিয়ারচরের ব্রহ্মপুত্র নদে ফেলে রাখেন। স্ত্রী রাবেয়া স্বামীর লাশ শনাক্ত করেন। গত ৯ জুলাই রহিমাকে গ্রেপ্তারের পর তিনি এ তথ্য প্রকাশ করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। রহিমার বক্তব্য থেকে ফুদুরের শ্বশুরবাড়িতে অনেককে ধরে এনে নির্যাতন করার তথ্য জানা গেছে।

গত ২৩ জুন মুক্তিপণের টাকার জন্য ফুদুর আলী বাজিতপুর উপজেলার বসন্তপুরের এক দরিদ্র স্বর্ণ কারিগর রতন বণিকের (৩৬) গোপনাঙ্গ কেটে দেন। পুলিশ জানায়, গত ১৮ জুন বাজিতপুর বাজারের লোকনাথ শিল্পালয়ের মালিক অরুণ দাস ওই কারিগরকে ফুদুরের জিম্মায় রেখে চার লাখ টাকা মূল্যের চোরাই স্বর্ণ আনেন। পরে অরুণ গা ঢাকা দেন।

রতন বণিক কালের কণ্ঠকে বলেন, “ফুদুর আলী আমার কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়েছিলেন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ফুদুর আমাকে বলেন, ‘তাহলে তুই মুসলমান হয়ে যা। ’ জীবন বাঁচানোর স্বার্থে আমি রাজি হয়ে যাই। পরে দুজন আমার দুই পা জাপটে ধরে রাখে। আরেকজন কাটার কাজ করে। ”

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ভোরে বাজিতপুর উপজেলার সাদিরচর গ্রামে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ফুদুর আলী (৩৬) নিহত হন।

বাজিতপুর থানার ওসি মকবুল হোসেন মোল্লা বলেন, ‘ফুদুর বাহিনীর সন্ত্রাসীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারেও অভিযান চলবে। ’


মন্তব্য