kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন লাশ এলেই বিড়ম্বনায় ঢাকা মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ

২ মাস ধরে মরচুয়ারিতে ১৪ জঙ্গির লাশ

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আর একটি নতুন লাশও সংরক্ষণ করার জায়গা নেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে। এখানে ১৫টি লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে ১৭টি।

মরচুয়ারির প্রায় পুরোটাই দখল করে আছে জঙ্গিদের লাশ। দীর্ঘদিন ধরে ১৪ জঙ্গির লাশ পড়ে আছে এখানে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে লাশ সরাতে বারবার অনুরোধ করলেও পুলিশ বলছে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জঙ্গিদের লাশ মরচুয়ারিতেই থাকবে। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতই নানা ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানায়, ওই হাসপাতালে মর্গের লাশ সংরক্ষণের জন্য পাঁচটি ফ্রিজ রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে দুটি ফ্রিজ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। প্রতিটি ফ্রিজে গাদাগাদি করেও পাঁচটির বেশি লাশ রাখা সম্ভব নয়। সে হিসাবে তিনটি সচল ফ্রিজে লাশ রাখা সম্ভব ১৫টি। কিন্তু বর্তমানে মরচুয়ারির ফ্রিজের কেবিনে লাশ আছে ১৭টি। এর মধ্যে রয়েছে ১৪ জঙ্গির লাশও। জানতে চাইলে মর্গে কর্মরত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মরচুয়ারির যে কেবিনে দুটি করে লাশ রাখা হয়েছে সেখানে একটি মোটা ও একটি পাতলা শরীরের লাশ কায়দা করে রাখা। এ ছাড়া কোনো পথও নেই। এরপর মরচুয়ারিতে রাখার জন্য লাশ এলে সেটি বাইরে রাখতে হবে। বেশ কিছুদিন ধরে এভাবেই চলছে। ফ্যানের নিচে লাশ রেখে দিতে হচ্ছে। বিভিন্ন আইনি ঝামেলা সত্ত্বেও আমরা পুলিশ বা মৃতের স্বজনদের তাগাদা দিচ্ছি। কিন্তু সংরক্ষণের লাশ কোনোভাবেই বাইরে, ফ্যানের নিচে রাখা উচিত নয়। কিন্তু আমরা অপারগ। এর ওপর মরচুয়ারির দুটি ফ্রিজ নষ্ট হয়ে আছে। ’

গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গেলে সেখানে কথা হয় মর্গ সহকারী সিকান্দার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সাধারণত একটি লাশ সাত দিনের বেশি মরচুয়ারিতে রাখা হয় না। সেখানে ১৪ জঙ্গির লাশ দুই মাস ধরে মর্গের মরচুয়ারিতে সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলো না নিচ্ছে পুলিশ না খোঁজ করছে পরিবার। তিনি বলেন, ‘সাত দিনের বেশি হলেই আমরা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াসাপেক্ষে লাশ স্বজনদের ফেরত দেই। ’ অজ্ঞাত হলে  ওই লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে বেওয়ারিশ হিসেবে দিয়ে দেওয়া হয়। তবে যেসব লাশের একাধিক দাবিদার থাকে আথবা আদালতের কোনো নির্দেশনা থাকে শুধু সেসব লাশই মরচুয়ারিতে সংরক্ষণে রাখা হয় আইনি জটিলতা শেষ হওয়া পর্যন্ত। এমন একটি লাশ বর্তমানে মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। খোকন চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির লাশ আড়াই বছর ধরে মরচুয়ারিতে পড়ে আছে। এই ব্যক্তির দুই স্ত্রী লাশের দাবিদার। গতকাল  ঘটনাচক্রে এক স্ত্রী হাবিবা আক্তার মরচুয়ারিতে আসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, আড়াই বছর ধরে স্বামীর লাশ মর্গ থেকে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এখন তাঁর স্বামীর লাশ জঙ্গিদের সঙ্গে মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। তিনি স্বামীর লাশ জঙ্গিদের থেকে আলাদা করে রাখার জন্য মর্গ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মর্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন বলেন, এই মুহূর্তে মরচুয়ারিতে নিহত ১৪ জঙ্গির লাশ রয়েছে। মরচুয়ারিতে লাশ রাখার আর কোনো খালি জায়গা নেই। তাই জঙ্গিদের সঙ্গেই ওই নারীর স্বামীর (খোকন চৌধুরী) লাশ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক এক নারী এবং এক ভারতীয় নাগরিকের লাশও (পুরুষ) জঙ্গিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। মরচুয়ারিতে জায়গা না থাকায়  কয়েকটি লাশ বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে। যদিও লাশ বাইরে রাখার নিয়ম নেই কিন্তু কোনো উপায়ও তো নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, জঙ্গিদের লাশ মর্গের মরচুয়ারি থেকে সরিয়ে নিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে আবেদন করেছে। তবে মামলার তদন্তের প্রয়োজনে লাশগুলো মর্গের মরচুয়ারিতে আছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো সরানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে পরিবারের সদস্যরাও এখনো নিহত জঙ্গিদের লাশ নিতে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। আবার পুলিশও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্তে যেতে পারছে না। বিশেষ করে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নিহত ছয় জঙ্গির লাশ দুই মাসের বেশি সময় ধরে মর্গে পড়ে আছে। যদিও তাদের পরিবার ও ঠিকানা শনাক্ত করে ফেলেছে পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম শাখার হিসাব অনুযায়ী গত দুই মাসে গুলশানের হলি আর্টিজান, কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ, রূপনগর ও আজিমপুরে গোয়েন্দা পুলিশের পৃথক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ২০ জন নিহত হয়। এদের মধ্যে হলি আর্টিজানে নিহত পাঁচ জঙ্গি ও সন্দেহভাজন একজনের লাশ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে।


মন্তব্য