kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ধুঁকছে ঢাকা নগর জাদুঘর

সংগৃহীত নিদর্শন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে

আপেল মাহমুদ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চার শতাধিক বছরের পুরনো ঢাকা নগর জাদুঘর। চরম অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় এর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ঢাকা নগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল জাদুঘরটি। ফুলবাড়িয়ার হাফেজ্জী হুজুুর সরণিতে অবস্থিত নগর ভবনের ষষ্ঠ তলায় প্রায় ১৮ বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কয়েকজন নগর বিশেষজ্ঞ ও ঢাকাপ্রেমীর উদ্যোগে সেখানে বেশ কিছু নিদর্শনও সংগৃহীত হয়েছিল।

অবজ্ঞা আর অনাদরে জাদুঘরের নিদর্শনগুলোর ওপর ধুলো জমেছে। বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো। এর কোনো কোনোটি নষ্ট হতে চলেছে। নতুন নিদর্শন সংগ্রহের কাজ তো থমকেই গেছে। লোকবল ও অর্থবলের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘরটি এখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এ সংকটের কথা স্বীকার করে জাদুঘরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর আর্থিক সংকট প্রকট রূপ ধারণ করেছে। নিজেরাই চলতে পারছি না, তার ওপর জাদুঘরের জন্য অর্থ ব্যয় করার বিষয়টি গরিবের ঘোড়া রোগের মতো ব্যাপার। ’

সরেজমিনে ঢাকা নগর জাদুঘরে গিয়ে দেখা গেল, সেখানকার সব কিছু অগোছালো। কেয়ারটেকারকে খুঁজে পাওয়া গেল না। অভ্যর্থনা কক্ষে বসে আছেন রুবেল নামের একজন কর্মচারী। তিনি নিজেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিচয় দিয়ে বললেন, ভেতরে যাওয়ার প্রবেশ ফি দুই টাকা। অন্য কর্মকর্তারা কোথায় প্রশ্ন করলে রুবেল জানান, জাদুঘরে লোকজন খুব একটা আসে না। তাই কর্মকর্তারা অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। জাদুঘরের কেয়ারটেকার ভূপেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তীর পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বললেন, ‘স্যার নিয়মিতই দায়িত্ব পালন করেন, আজ বিশেষ কাজে বাইরে আছেন। ’

যোগাযোগ করলে কেয়ারটেকার টেলিফোনে বলেন, ‘ভাই, জাদুঘরের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। আর্থিক সংকটের কারণে তা যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তা বাঁচানোর জন্য এর পক্ষে ইতিবাচক রিপোর্ট করবেন। ’

দুই টাকা দিয়ে টিকিট কেনা হলো। জাদুঘরের ভেতরে গিয়ে হাবিবুর রহমান পাঠান নামের একজন দর্শনার্থী পাওয়া গেল। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘দেশে দুই টাকার ব্যবহার প্রায় উঠে গেছে। অথচ নগর জাদুঘরের প্রবেশ ফি রাখা হয় দুই টাকা। টিকিট কাটার সময় বলা হলো ভাংতি নেই। ছয়তলা থেকে নিচে নেমে পান কিনে ভাংতি করে দুই টাকা দেওয়ার পর জাদুঘরে প্রবেশের অনুমতি পাই। ’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নগর জাদুঘরে ঢাকার পুরনো বেশ কিছু নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার সর্দারদের ব্যবহূত আসবাবপত্র যেমন—ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার, দেয়াল ঘড়ি; তৈজসপত্র যেমন—পানদানি, পানের বাটা, তামার প্লেট, গ্লাস, হুকা এবং এসবের ছবি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রয়েছে একটি পুরনো ছাপার যন্ত্র। ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ প্রকাশিত ঢাকার প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ঢাকা প্রকাশ যে ছাপার যন্ত্রে ছাপা হতো এটি সে ধরনের যন্ত্র। যে কারণে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক।

ঢাকা বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ঢাকা কোষ সূত্রে জানা যায়, ঢাকার পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ঢাকাবিষয়ক অসংখ্য গ্রন্থ রচয়িতা এবং ঢাকার খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুনসহ আরো কয়েকজন ঢাকাপ্রেমী ১৯৮৭ সালের ২০ জুন জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর সূচনা হয়েছিল পুরান ঢাকার পাঁচ ভাই ঘাট লেনের একটি বাসায়। ১৯৯৬ সালের ২০ জুলাই তা অধিগ্রহণ করে ঢাকা নগর ভবনে আনা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এর উদ্বোধন করেন, যার উদ্বোধনী ফলক এখনো জাদুঘরের প্রবেশপথে খোদিত রয়েছে। জাদুঘরটি পরিচালনার জন্য বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলামকে সভাপতি ও ঢাকার ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। সদস্য ছিলেন নগরবিদ ড. নজরুল ইসলাম, স্থপতি রবিউল হুসাইন, শিল্পী হাশেম খান, ঢাকার আদি বাসিন্দা ও ঢাকা গবেষক হাসেম সুফী প্রমুখ।

উল্লিখিত ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় ওই জাদুঘরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংগৃহীত হয়। ঢাকাবিষয়ক ভিউকার্ড, পোস্টারসহ ১৩টি ঢাকাবিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থগুলো হলো মোহাম্মদ আব্দুল কাইউমের ‘চকবাজারের কেতাবপট্টি’, শামসুর রাহমানের ‘স্মৃতির শহর ঢাকা’, ড. আব্দুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’, মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকার হারিয়ে যাওয়া কামান’, প্যাট্রিক গ্যাড্ডেসের ‘ঢাকা নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা’ ও হেদায়েত হোসেন মোরশেদের ‘ঢাকার গেরিলা মুক্তিযুদ্ধ’ প্রভৃতি।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের অনীহা, আর্থিক অসহযোগিতার কারণে ঢাকা নগর জাদুঘরের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে বলে একাধিক ট্রাস্টি কালের কণ্ঠকে জানান। তাদের কর্তৃত্বের কারণে ট্রাস্টির কোনো মতামতই কাজে আসেনি। সংগত কারণে জাদুঘরটি ঠিকমতো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার কারণ সিটি করপোরেশন নিজেই। ট্রাস্টিরা আরো অভিযোগ করেন, নগরপিতা হয়ে যাঁরা নগর ভবনে এসেছেন তাঁরা বিপণি ব্যবসা, ক্ষমতাবাজি নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। জাদুঘরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দেওয়ার সময় পাননি তাঁরা। যে কারণে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

ডিএসসিসির সমাজকল্যাণ শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন কপর্দকশূন্য। তাই ট্রাস্টিদের পক্ষে বেসরকারি সংস্থা থেকে অনুদান এনে জাদুঘরটি নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে। ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুন এরই মধ্যে কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে কথাও বলেছেন। আশা করা যাচ্ছে অনুদান পাওয়া যাবে। ’ কিন্তু ড. মুনতাসীর মামুন এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা জাদুঘরের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো অনুদান দিতে রাজি হচ্ছে না। ’


মন্তব্য