kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা

উন্নয়নের পথনকশা চূড়ান্ত

২০ বছরে লাগবে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা

পার্থ সারথি দাস   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রাজধানীর যানজট কমাতে দ্রুত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার হবে। ওই সময়ের মধ্যে রাজধানী ও আশপাশে পাঁচটি মেট্রো রেল, দুটি বিআরটি ও ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে।

তিনটি বৃত্তাকার সড়কও নির্মাণ করা হবে।

ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) বলা হয়েছে, যানবাহনের চাহিদার ৬৪ শতাংশ পূরণ করতে পারবে পাঁচটি মেট্রো রেল ও দুটি বিআরটি। ঢাকা মহানগর ও আশপাশের বাসের রুট সমন্বয় করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বাস কম্পানি গঠন করা হবে। জাপানের তিনটি সংস্থা ২০ বছরের এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। গত ২৯ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদন করা হয়েছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন ২০১২ অনুযায়ী, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বা ডিটিসিএ আরএসটিপির অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পে সম্মতি দেওয়া ও বাস্তবায়ন সমন্বয় করবে।

বিশ্বের শীর্ষ দশ যানজটের শহরের তালিকায় ঢাকার নাম রয়েছে। বছরে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে যানজটে। দিনে গড়ে ৮৩ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার জ্বালানির অপচয় হচ্ছে।

রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে ২০০৪ সালে প্রণীত হয় ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি)। গত প্রায় এক দশকে এর অনেক সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাই এটিকে আরো ২০ বছর মেয়াদে সংশোধন করা হয়েছে।

আরএসটিপির তথ্যানুসারে, রাজধানীর বর্তমান জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। ২০৩৫ সালে হবে দুই কোটি ৬৩ লাখ। অর্থাৎ জনসংখ্যা ৫৫ শতাংশ বাড়বে। তখন নগরীতে যানবাহনের ট্রিপ হবে পাঁচ কোটি ১১ লাখ। বর্তমানে ট্রিপের সংখ্যা দুই কোটি ৯৮ লাখ। ট্রিপ ৭১ শতাংশ বাড়বে। একটি যানের যাত্রার শুরু থেকে গন্তব্য পর্যন্ত এক ট্রিপ ধরা হয়।

এসটিপির লক্ষ্য ছিল ঢাকা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কের উন্নয়ন, মহানগরীর প্রবেশ ও নির্গমন পয়েন্টগুলোতে যানজট নিরসন এবং পরিকল্পিত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০০৬ সালে অনুমোদনের পরবর্তী তিন বছরে এসটিপির সুপারিশ বাস্তবায়নে তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পর্যায়ক্রমে প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু গত প্রায় সাড়ে সাত বছরে ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের এলাকার জনসংখ্যা ও আয়তন বেড়ে গেছে। এই সময়ে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর-দক্ষিণে ভাগ হয়েছে। দুটির পরিধিই বেড়েছে। ঢাকার চারদিকে গড়ে উঠছে নতুন উপশহর, আবাসিক ও শিল্প এলাকা। এ সময়ে পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সেবা যুগোপযোগী করার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে জাইকার সহায়তায় এসটিপি সংশোধন করার কাজ শুরু হয়। জাপানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এএলএমইসি করপোরেশন, ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্টস গ্লোবাল লিমিটেড ও কাতাহিরা অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টারন্যাশনাল গত বছরের সেপ্টেম্বরে সংশোধিত এসটিপি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। গত ২৯ আগস্ট এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়।

সংশোধিত এসটিপি অর্থাৎ আরএসটিপির মূল সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) বা মেট্রো রেলপথ নির্মাণ করা। একটির (এমআরটি-৬, উত্তরা থেকে মতিঝিল) কাজ শুরু হয়েছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। পাঁচটি মেট্রো রেলপথ নির্মাণের জন্য এক লাখ ৫৯ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার হবে। এমআরটি-৬-কে উত্তরা থেকে আশুলিয়া ও মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে আরএসটিপিতে। এর দৈর্ঘ্য হবে ৪১ কিলোমিটার। এমআরটি-১ গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে বিদ্যমান রেলপথ ধরে কমলাপুর হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত। এমআরটি-২ আশুলিয়া থেকে সাভার, গাবতলী, মিরপুর রোড হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবনের (নগর ভবন) সামনে দিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত। এটি ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এমআরটি-৪ কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। এটি ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। এমআরটি-৫ ভুলতা থেকে বাড্ডা, মিরপুর সড়ক, মিরপুর-১০, গাবতলী বাস টার্মিনাল, ধানমণ্ডি, বসুন্ধরা সিটি (পান্থপথ) হয়ে হাতিরঝিল লিংক রোড পর্যন্ত। এমআরটি-১, ২, ৪ ও ৬-কে সংযুক্ত করবে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ।

আরএসটিপিতে দুটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটির সুপারিশও করা হয়েছে। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত একটি বিআরটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

আরএসটিপিতে অভ্যন্তরীণ (ইনার), মধ্যবর্তী (মিডল) ও বহিস্থ (আউটার) নামের তিনটি চক্রাকার সড়ক (রিং রোড) এবং ইনার ও আউটার রিং রোডকে সংযুক্ত করার জন্য আটটি রেডিয়াল সড়ক নির্মাণ করতে বলা হয়েছে। আটটি রেডিয়াল সড়ক হবে ঢাকা-জয়দেবপুর, ঢাকা-টঙ্গী-ঘোড়াশাল, ঢাকা-পূর্বাচল-ভুলতা, ঢাকা-কাঁচপুর-মেঘনা সেতু, ঢাকা-সাইনবোর্ড-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-ঝিলমিল-ইকুরিয়া, ঢাকা-আমিনবাজার-সাভার ও ঢাকা-আশুলিয়া-ডিইপিজেড।

এ ছাড়া নির্মাণ করা হবে ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে। এসবের মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু বিভাগ। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কাজের উদ্বোধন হয়েছে। অন্য চারটি হলো ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-সিলেট এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা-ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসওয়ে।

সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৩১ আগস্ট নিজ মন্ত্রণালয়ে আরএসটিপি বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার ২০ বছরের (২০১৫-৩৫) পরিকল্পনা সমন্বিত করে সংশোধিত এসটিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের পর এক দশক ধরে সমন্বিত কর্মযজ্ঞ হয়নি। তাই পরিকল্পনা সংশোধন করতে হয়েছে। আরএসটিপির সুপারিশ সময়মতো বাস্তবায়ন করলে যানজট থেকে, বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।


মন্তব্য