kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জল্লাদ শাহজাহান

৪৯ জনের ফাঁসি কার্যকর যার হাত দিয়ে

সরোয়ার আলম ও শরীফ আহমেদ শামীম গাজীপুর থেকে ফিরে   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হত্যাসহ দুই মামলায় ৪৩ বছরের সাজা নিয়ে কারাবন্দি শাহজাহান ভুঁইয়া। কারাবাসে ইতিমধ্যে কেটে গেছে ২৪ বছর।

আর কারাগারে এই কয়েদির আলাদা একটা পরিচিতি আছে জল্লাদ হিসেবে। কারণ বিভিন্ন মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্র্রাপ্ত ৪৯ ব্যক্তির সাজা কার্যকর হয়েছে এই কয়েদির হাত দিয়ে।

জল্লাদ শাহজাহান ভুঁইয়ার মাধ্যমে যাঁদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পাঁচজন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা বাংলা ভাইসহ কয়েকজন জঙ্গি নেতা, খুলনার এরশাদ শিকদার, আলোচিত শারমিন রিমা হত্যা মামলার আসামি মনির ও কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীও রয়েছেন। আর এসব দণ্ড কার্যকর করে এ পর্যন্ত তাঁর ৯ বছরের সাজা মওকুফ হয়েছে। গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দি এই কয়েদি এখন বাকি সাজা মওকুফে সরকারের বিশেষ অনুকম্পা প্রত্যাশা করছেন।

কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক কালের কণ্ঠকে জানান, ‘জল্লাদের কঠিন কাজ করলেও শাহজাহান কারাগারে ভালো মানুষ। পরোপকারী হিসেবে তাঁর পরিচিতি আছে। কারাগারের নিয়ম-কানুনও তিনি ভালোভাবেই মেনে চলেন। রেকর্ডপত্র অনুযায়ী তিনি এ পর্যন্ত ৪৯ দণ্ডপ্রাপ্তকে ফাঁসি দিয়েছেন। একজনের ফাঁসি কার্যকরের জন্য দুই মাসের সাজা রেয়াত দেওয়া হয়। মূলত সাজা কমিয়ে মুক্তি পেতেই শাহজাহান জল্লাদের কাজ করেন। ফাঁসি এবং কারাগারে ভালো কাজ মিলিয়ে তিনি এ পর্যন্ত আট বছর আট মাসের কিছু বেশি সাজা রেয়াত পেয়েছেন। মুক্তির জন্য তাঁকে এখনো ১০ বছর তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন তাঁর জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানালে এবং রাষ্ট্রপতি সদয় হলেই কেবল নির্ধারিত সময়ের আগে তাঁর মুক্তির সুযোগ থাকছে। ’

কারাগার সূত্র জানায়, দুই মামলায় শাহজাহান ভুঁইয়ার সাজা হয় ৪৩ বছর। সাজা ভোগ শেষে মুক্তির দিনক্ষণ ছিল ২০৩৫ সালের ৭ নভেম্বর। ইতিমধ্যে আট বছর আট মাসের সাজা রেয়াত পাওয়ায় ২০২৬ সালের নভেম্বরে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী একজনের ফাঁসি কার্যকরের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কয়েদির দুই মাসের সাজা মওকুফ হয়। বিষয়টি জানার পর বন্দিজীবন থেকে দ্রুত মুক্তির আশায় শাহজাহান ভুঁইয়া নাম লেখান জল্লাদের খাতায়। প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি দেশের প্রধান জল্লাদ হিসেবে কারাগারে আছেন।

কারাগারের নথি অনুযায়ী, নরসিংদীর পলাশের ইছাখালী গ্রামের মৃত হাসান আলীর ছেলে শাহজাহান ভুঁইয়ার বর্তমান বয়স ৭০ বছর। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে শাহজাহান বড়। ১৯৭৪ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কর্মজীবন শুরু করেন সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে। অনুমতি ছাড়া ১১ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। পরে কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে যোগ দেন রাজনীতিতে। ১৯৭৬ সালে দলের নরসিংদী মহুকুমার সভাপতি নিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে এলাকার এক তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। বিষয়টি জানাজানির পর তাঁকে সামাজিক সাজা দেওয়া হয়। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দুর্ধর্ষ।

পুলিশ সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে মানিকগঞ্জ সদর থানায় ডাকাতির ঘটনায় এক ব্যক্তি নিহত হয়। ওই ঘটনায় শাহজাহান ভুঁইয়াকে আসামি করে অবৈধ অস্ত্র বহন ও হত্যার দায়ে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মানিকগঞ্জের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক ১৯৯২ সালের ৮ নভেম্বর অস্ত্র মামলায় তাঁকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। ওই দিনই গ্রেপ্তার হয়ে শুরু হয় তাঁর কারাবন্দি জীবন। পরবর্তী সময়ে অন্য মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন (৩০ বছর) সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। প্রথম সাজায় ১২ বছর ও দ্বিতীয় সাজায় ৩০ বছর মিলিয়ে তাঁর সাজার পরিমাণ দাঁড়ায় হয় ৪২ বছর। দুই মামলায় জরিমানার অর্থ অনাদায়ের কারণে আরো এক বছর যোগ হয়ে তাঁর সাজা নির্ধারণ হয় ৪৩ বছর।


মন্তব্য