kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চরের জনপদে

আরিফুজ্জামান তুহিন, পায়রা, পটুয়াখালী থেকে ফিরে   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চরের জনপদে

বড় বড় ভারী ক্রেন দিয়ে মালামাল ওঠানামা করছে। কোথাও ইস্পাতের ঝালাই হচ্ছে, কোথাও মাটি সরানো হচ্ছে।

ক্রমশ আকার পাচ্ছে পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্রটির। এক সময়ের পতিত জমিতে রাত-দিন খেটে বাংলাদেশিদের সঙ্গে প্রায় ২০০ চীনা শ্রমিক-প্রকৌশলী বিদ্যুেকন্দ্রটি গড়ে তুলছেন। এ কেন্দ্রের জন্য প্রায় এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে অনেক আগেই। অধিগ্রহণের অর্থও পেয়েছেন জমির মালিকরা। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পায়রাতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য ১৩২ পরিবারের ৯৮২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। মধুপাড়া, নিশান বাড়িয়া, দশরহাউলা, মরিচ বুনিয়া গ্রামের পরিবারগুলো বসতভিটার জন্য একরপ্রতি সাড়ে সাত লাখ টাকা এবং নাল জমির জন্য পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের হিসাবে মোট ৬৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে জমির মূল্য বাবদ। নগদ অর্থ ছাড়াও জমির সব মালিক আধুনিক সুবিধার পাকা বাড়িসহ বহু কিছু পাবেন। প্রকল্প এলাকা দেখতে আসা মো. আশফাক বললেন, ‘এখানে তাঁর জমি ছিল। এই যে একটু একটু করে বিদ্যুেকন্দ্রের আকার নিচ্ছে। এটা দেখতে ভালোই লাগে। মনে হয় আমার জমিতেই বিদ্যুেকন্দ্র হচ্ছে। ’

‘ভালোলাগার আরো কিছু কারণ আছে’ এমন মন্তব্য করে আশফাক বলেন, ‘পাকা বাড়ি, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, মসজিদ নির্মাণ হবে আমাদের জন্য। এ ছাড়া একটি বিশেষায়িত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে। আর এখানে পড়বে আমাদের ছেলেমেয়েরাই। অনেকে কাজ পাবে এ বিদ্যুেকন্দ্রে। এ কেন্দ্র ঘিরে আমরা স্বপ্ন বুনছি। এ কেন্দ্র নির্মাণ হলে আমার একার না গোটা এলাকার মানুষেরই জীবন পাল্টে যাবে। ’

কেন্দ্র নির্মাণে রাত-দিন কাজ : পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রটি সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প ফাস্ট ট্রাকের নয়—কিন্তু এর পরও এর গতি ফাস্ট ট্রাক প্রকল্পের চেয়েও ভালো। এ কারণে সরকারের নীতিনির্ধারকরা একে ‘সুফার ফাস্ট’ প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণযজ্ঞ। কয়েক শ মানুষ কাজ করছেন, যাঁদের বেশির ভাগই চীনের। তাঁদের মধ্যে প্রকৌশলী, সাধারণ শ্রমিক, জরিপকারক রয়েছেন। চীন থেকেই আনা হয়েছে বেশির ভাগ নির্মাণযন্ত্র। বৃষ্টির মধ্যেই চলছে বিদ্যুেকন্দ্রের পাইলিংয়ের কাজ। প্রকল্প এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি পরিদর্শন বাংলো। এটিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। এ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই—সে কারণে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

জানা গেছে, চুক্তির পর থেকেই কেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু, আর টেস্ট পাইলিং শুরু হয়েছে গত ২২ আগস্ট থেকে। আর বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণের মূল পাইলিংয়ের কাজ শুরু হবে আগামী নভেম্বরে। নকশা অনুযায়ী প্রায় চার হাজার পাইলিং করবে দেশীয় আরেক কম্পানি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) এবং চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পাইলিং শেষ হলে বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রাংশ বসানোর কাজ শুরু হবে।

জানা গেছে, মাত্র চার মাসে ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে। এরপর তিন মাসে এটিকে কেন্দ্র নির্মাণের উপযোগী করা হয়েছে। ১৩২০ মেগাওয়াটের মতো এত বড় বেইজ লোড পাওয়ার স্ট্রেশন নির্মাণে সময় লাগে সাড়ে তিন বছর। তবে চীনা প্রকৌশলীরা এটিকে তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ করার টার্গেট নিয়ে কাজ করছেন। এ জন্যই দিন-রাত মিলিয়ে কাজ চলছে।

চীনের বিনিয়োগে প্রথম বিদ্যুেকন্দ্র : বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন বহুদিনের অংশীদার। দেশটি বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন নির্মাণসহ বহু উন্নয়ন প্রকল্প করছে। তবে এসব উন্নয়ন প্রকল্প চীন করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কিন্তু এই প্রথম পায়রার ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্রে চীন বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের কোনো প্রকল্পে মালিকানারও অংশ হলো।

জানা গেছে, ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি। ২০১৪ সালে সই হওয়া ওই এমওইউর আলোকে সমান অংশীদারির একটি যৌথ মূলধনী কম্পানি গঠন করা হয়।   গত ২২ মার্চ বিদ্যুেকন্দ্রটি নির্মাণে ১২ হাজার ২৮৪ কোটি ৫৫ লাখ ৬৫ হাজার ৯৪৩ টাকার চুক্তি হয়।

কেন্দ্র নির্মাণে আড়াই বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরে ঋণচুক্তিটি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এলাকাবাসীর জন্য বছরে বরাদ্দ ২০ কোটি টাকা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বিদ্যুৎ বিভাগ কয়লাচালিত বিদ্যুেকন্দ্রে স্থানীয়দের উন্নয়নে একটি নতুন আইন করেছে। এই আইন অনুযায়ী প্রতি উইনিট বিদ্যুৎ থেকে তিন পয়সা করে কেটে রেখে একটি তহবিল গঠন করা হবে, যা সোস্যাল করপোরেট রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ড নামে পরিচালিত হবে। বছরে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুেকন্দ্রে সিএসআর ফান্ড থেকে অন্তত ২০ কোটি আসবে। এ অর্থের পুরোটাই খরচ করা হবে স্থানীয়দের বিভিন্ন কল্যাণে। কয়লাচালিত বিদ্যুেকন্দ্রের আশপাশের মানুষ এই সুবিধা পাবে।

ভূমি অধিগ্রহণে মডেল হতে পারে : দেশে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে এর বিরুদ্ধে জমির মালিকরা আন্দোলন করেন—এ দৃশ্য বাংলাদেশে খুবই পরিচিত। তবে পায়রা বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে জমি অধিগ্রহণে স্থানীয়রা জমি দিতে আপত্তি জানায়নি। এর কারণ জানতে চাইলে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে জমির সংকট রয়েছে। জমির দাম দিয়ে যদি মালিককে উচ্ছেদ করেন তবু ওই অর্থ দিয়ে ভবিষ্যতে তার পক্ষে উঠে দাঁড়ানো কঠিন হয়। এ জন্য আমরা জমির মালিকদের জমির অর্থ মূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি আলাদা করে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প করে দিচ্ছি। এখানে সেমিপাকা বাড়ি করে দেওয়া হবে ১৩২টি পরিবারকে। থাকবে আধুনিক সব সুবিধা। একই সঙ্গে একটি কারিগরি বিদ্যালয় আমরা স্থাপন করছি। ’

আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুেকন্দ্রটির প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসবে ২০১৯ সালের জুন মাসে, আর দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে আসবে একই বছরের ডিসেম্বরে। বিদ্যুেকন্দ্রের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় হবে ছয় টাকা ৬৫ পয়সা। চীন, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বিদ্যুেকন্দ্রটির জন্য কয়লা আমদানি করা হবে। বলা হচ্ছে, বিদ্যুেকন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে টনপ্রতি কয়লার ব্যয় দাঁড়াবে ১০০ ডলার।


মন্তব্য