kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টাম্পাকোয় বিস্ফোরণ

ঈদে বাড়ি ফিরলেন তাঁরা লাশ হয়ে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সাত বছরের মেয়ে সাদিয়ার জন্য ঈদের জামা ও জুতা নিয়ে গতকাল রবিবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল সিলেটের সাইদুর রহমানের। কিন্তু এর আগেই শনিবার সকালে আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ দিতে হলো তাঁকে।

লাশ হয়ে ফিরলেন বাড়িতে। তাঁর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। সেখানে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা কারো নেই। একই পরিস্থিতি চলছে সিলেটে আরো পাঁচজন, হবিগঞ্জে দুই বোন ও পিরোজপুরে এক ব্যক্তির বাড়িতে। এঁরা সবাই গাজীপুরের টঙ্গীর টাম্পাকো কারখানায় বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সিলেট : গত শনিবার সকালে গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে নিহতদের ছয়জন সিলেটের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে গোলাপগঞ্জ উপজেলারই পাঁচজন। অন্যজন সিলেট নগরের বাসিন্দা। তাঁরা ওই কারখানায় কাজ করতেন।

সিলেটের যে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা হলেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার আমুড়া ইউনিয়নের সুন্দিশাইল গ্রামের মজর আলীর ছেলে আব্দুর রহিম (৫০), একই এলাকার তমজিদ আলীর ছেলে সাইদুর রহমান (৪৮), মৃত তজম্মুল আলীর ছেলে ওয়ালী হোসেন কুটি মিয়া (৩২), সোনা মিয়ার ছেলে এনামুল হক এনাম (৩৫) ও কানিশাইল গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে রেজওয়ান আহমদ (৩৩)। তবে রেজওয়ানের লাশ এখনো পাওয়া যায়নি বলে তাঁর পরিবার সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া সিলেট নগরের সোনারপাড়ার অধিবাসী মাহতাবুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান মিজান (২৭) অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বাড়িই সুন্দিশাইল গ্রামে। এই গ্রামে চলছে এখন শোকের মাতম। নিহতদের স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় অন্য রকম পরিবেশ গ্রামটিতে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে বাকরুদ্ধ নিহতদের স্বজনরা।

জানা যায়, নিহত এনামুল হক এনাম ১২ বছর ধরে কাজ করছিলেন টাম্পাকো ফয়েলসে। অন্ধ বাবা সোনা মিয়াকে বলেছিলেন, রবিবার ঈদের বেতন ও বোনাস নিয়ে বাড়ি আসবেন। শোধ করবেন বাবার ঋণের টাকা। কিন্তু তাঁর আর বাড়ি ফেরা হলো না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোনা মিয়া বলেন, ‘ছেলে কইছলো, টাকা লইয়া আইব, ঋণ মারব। কিন্তু সকালে ছেলের বউ কইল, কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা গেছে এনামুল। আগুন আমার সব শেষ করি দিছে। এখন আমি কিলা খাইমু, কিলা চলমু। ’

নিহত সাইদুরের স্বজনরা জানান, বাড়িতে তাঁর সাত বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। মেয়ের জন্য ঈদের জামা ও জুতা নিয়ে রবিবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু শনিবার সকালেই খবর পান সাইদুর মারা গেছেন।

গোলাপগঞ্জের আমুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রুহেল আহমদ বলেন, নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজন তাঁর ইউনিয়নের। তিনি বলেন, নিহতরা খুবই দরিদ্র পরিবারের। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি মারা যাওয়ায় পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

এদিকে নিহতদের মধ্যে একজন মিজানুর রহমান মিজান সিলেট নগরের সোনারপাড়ার বাসিন্দা। নিহতের সহপাঠী আতিকুর রহমান নগরী বলেন, মিজানের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যালে শনাক্ত করেছেন তাঁর বাবা ও চাচা। তবে একমাত্র ছেলেকে হারানোর খবর তাঁর মা ও বোনকে জানানো হয়নি। তিনি বলেন, এ মাসের বেতন পেয়ে রবিবার বাড়িতে আসার কথা ছিল। কিন্তু সে আশা আর পূরণ হলো না।

এদিকে গতকাল নিহত পাঁচজনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল দুপুর ২টায় সুন্দিশাইল গ্রামের নিহত আব্দুর রহিম, সাইদুর রহমান, কুটি মিয়া ও এনাম—এই চারজনের জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে সকালে নিহতদের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে গোলাপগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সিলেট নগরের সোনারপাড়ার বাসিন্দা মিজানের জানাজা সকাল ১১টায় স্থানীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

হবিগঞ্জ : এবার বাড়িতে এসে সবার সঙ্গে ঈদ করার কথা ছিল দুই বোন তাহমিনা ও রোজিনার। দারিদ্র্যের মাঝেও তাঁদের আগমনের খবরে উৎসাহের কমতি ছিল না পরিবারের লোকজনের মাঝে। দুই বোন ঠিকই আসলেন বাড়িতে। তবে আনন্দের উপলক্ষ নিয়ে নয়, এলেন স্বজনদের অশ্রু ঝরিয়ে।

রবিবার রাত ৩টায় বাড়িতে দুই বোনের লাশ পৌঁছায়। টাম্পাকো কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে নিহতদের দুই বোন তাহমিনা ইয়াসমিন (২২) ও রোজিনা ইয়াসমিন (২৫) উপজেলার ঘনশ্যামপুর গ্রামের দরিদ্র আবু হানিফের মেয়ে। তাঁরা উভয়ই ওই কারখানায় কাজ করতেন।

প্রিয়জনদের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে নিহতদের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। খবর পেয়ে রবিবার আত্মীয়স্বজনও আসে বাড়িতে। তাদের কান্নায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। গতকাল সকালে জানাজা শেষে পারিবারিক করবস্থানে নিহত দুই বোনের লাশ দাফন করা হয়।

নিহত দুই বোনের বাবা আবু হানিফ বলেন, তাঁর দুই মেয়ে সাত বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করতেন। রবিবার তাঁদের ঈদ বোনাস ও বেতন নিয়ে বাড়িতে আসার কথা ছিল। আবু হানিফের ছয় মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে নিহত দুই বোন বড়। তাঁরাই মূলত পরিবার চালাত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল এ দুই মেয়েকে হারিয়ে অসহায় বাবা এখন বাকরুদ্ধ।

পিরাজপুর : ঈদ করতে গতকাল শ্রমিক আল-মামুন দুলালের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তবে দুলাল বাড়িতে ফিরেছেন লাশ হয়ে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার আল-মামুন দুলাল (৪৫) টাম্পাকো কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার উত্তর বড়মাছুয়া গ্রামের নূরুল আমীন আকনের মেজ ছেলে। তিনি এক মেয়ে ও  দুই ছেলের বাবা। গতকাল দুপুরে দুলালের লাশ বড়মাছুয়া গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছলে স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, টাম্পাকো কারখানা কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া বাবদ নগদ ১৭ হাজার টাকা এবং নিহতের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে দুলালের লাশ বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। গতকাল দুপুরে জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে নিহত দুলালের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

দুলালের স্ত্রী খাজিদা বেগম জানান, শনিবার রাতের গাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা ও সন্তানদের সঙ্গে ঈদ করতে আসবেন বলে স্বামী দুলাল মোবাইলে জানিয়েছিলেন। স্বামী বাড়ি ফিরে আসছেন লাশ হয়ে।


মন্তব্য