kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এনবিআরের প্রতিবেদন

চোরাই পণ্য বেচাকেনা অভিজাত এলাকায়

ফারজানা লাবনী   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চোরাই পণ্য বেচাকেনা অভিজাত এলাকায়

দেশের অভিজাত এলাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বা বাড়ি ভাড়া নিয়ে কিছু বিদেশি চোরাই পণ্যের কারবার করছে। বিদেশি চোরাকারবারিদের অনেকে আবার পরিচয় গোপন করে চোরাই পণ্য বিক্রি করছে নামিদামি হোটেলেও।

আর চোরাই পণ্য বিক্রি করে পাওয়া অর্থের একাংশ তারা পাচার করে দিচ্ছে। জঙ্গি কার্যক্রমেও সরবরাহ করা হচ্ছে কিছু অর্থ। বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি এসব বিদেশি চোরাকারবারিকে সহযোগিতা করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের পাঠানো এক প্রতিবেদনে অভিজাত এলাকায় বিদেশিদের চোরাই পণ্যের কারবারের এসব তথ্য উল্লেখ আছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট বা মূসক গোয়েন্দা, নিরীক্ষা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অভিযানে পাওয়া তথ্য থেকে আলাদা দুটি প্রতিবেদন তৈরি করে গত সপ্তাহে এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে জমা দেন। ওই দুটি প্রতিবেদন থেকে তথ্য নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ভ্যাট ও শুল্ক গোয়েন্দাদের পৃথক অভিযানে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, ধানমণ্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নামিদামি হোটেল, ফ্ল্যাট, বাড়ি থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার চোরাই পণ্যসহ ২৭ বিদেশি চোরাকারবারিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযানে শাড়ি, থ্রিপিসসহ বিভিন্ন পোশাক ছাড়াও শিশুদের মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়া দুধ, নকল ওষুধ, মোবাইল ফোনসেট, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ল্যাপটপ, নকল কসমেটিকসামগ্রী, ইয়াবা বড়িসহ প্রচলিত-অপ্রচলিত বিভিন্ন মাদকদ্রব্য, ভায়াগ্রাসহ বিভিন্ন যৌন উত্তেজক সামগ্রী, এটিএম কার্ড, নকল বিদেশি মুদ্রা আটক করা হয়। চোরাই পণ্য বিক্রি করে পাওয়া অর্থ কিভাবে ও কোন পদ্ধতিতে স্থানান্তর করা হচ্ছে তার কোনো বৈধ কাগজপত্র তদন্তকালে এনবিআর কর্মকর্তাদের দেখাতে পারেনি অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। অভিযানকালে জব্দ করা কাগজপত্র যাচাই করে ৭৬ কোটি টাকা পাচারের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে পাচার করা হয়েছে।     

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ভারতের নাগরিক রাহুল সঞ্জয় জুনজুনওয়ালার ওপর ছয় মাস ধরে নজর রাখছিলেন ভ্যাট গোয়েন্দারা। জুনজুনওয়ালা নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে চার দিনের মেলা করতে রাজধানীর গুলশান এলাকার সিক্স সিজন হোটেলে ৪০০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেন। গত ২২ জুন আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে মুম্বাইয়ের অধিবাসী জুনজুনওয়ালা মিথ্যা ঘোষণায় ছয়টি কার্টনে শাড়ি, থ্রিপিসসহ বিভিন্ন পোশাক বাংলাদেশে ঢুকিয়ে স্থলপথে গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে এনে মজুদ করেন। সেখান থেকে দফায় দফায় চোরাই পণ্য মেলায় নিয়ে বিক্রি করা হয়। ভ্যাট গোয়েন্দারা গত ২৪ জুন রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালিয়ে সিক্স সিজন হোটেল থেকে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার ভারতীয় রুপির চোরাই পণ্যসহ জুনজুনওয়ালাকে আটক করেন। তাঁর সঙ্গে থাকা পণ্য ও কাগজপত্র জব্দ করা হয়। পণ্য বিক্রি করা অর্থ কোথায় কার কাছে বা কী পদ্ধতিতে স্থানান্তর করা হয়েছে তার পক্ষে বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি। ওই পণ্য বিক্রি করে পাওয়া অর্থ পাচারের বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দারা তদন্তে নিশ্চিত হন। জুনজুনওয়ালা মোবাইল ব্যাংকিং বা বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তিকে অর্থ সরবরাহ করেছেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বেলাল চৌধুরী। গত বুধবার এই কর্মকর্তা এনবিআরের পরিসংখ্যান শাখায় বদলি হয়েছেন। গত মঙ্গলবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, জুনজুনওয়ালার বিরুদ্ধে চোরাচালানির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। অবৈধ পণ্য বিক্রি ও ব্যবসা করতে সুযোগ দেওয়ায় সিক্স সিজন হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এত পণ্য শুল্ক স্টেশন ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণায় কিভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তা তদন্ত করতে ভ্যাট কমিশনারেট কুমিল্লাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিক্রীত অর্থ কিছু পাচার করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের মধ্যে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। কাদের অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।  

ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসে এসব অর্থ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। কারা জড়িত, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের খতিয়ে দেখতে এনবিআর থেকে তথ্য সরবরাহ করে সহযোগিতা করা হয়েছে।  

শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে আরেক পাকিস্তানি চোরাকারবারিকে প্রায় দেড় কোটি টাকার চোরাই থ্রিপিসসহ গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে আটক করা হয়। পাকিস্তান হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা অভিযান পরিচালনাকারী এনবিআর কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ওই পাকিস্তানিকে অভিযানস্থল থেকেই নিজের জিম্মায় নিয়ে যান। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থপাচারসহ চোরাই পণ্য বিক্রি করা অর্থ দেশের মধ্যে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদে ব্যবহারেরও তথ্য মিলেছে শুল্ক গোয়েন্দাদের চূড়ান্ত তদন্তে। একইভাবে দুবাই থেকে আসা আরেক বিদেশিকেও উত্তরা থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকার সোনা, মোবাইল ফোনসেটসহ আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহের বিষয়টি উঠে এসেছে শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত সাত মাসের অভিযানে শুধু রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকা থেকে চোরাই পণ্যসহ আটক করা হয়েছে পাকিস্তান, দুবাই, ভারত, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের ২৭ জন চোরাকারবারিকে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, অভিজাত এলাকা থেকে চিহ্নিত চোরাকারবারিরা যেসব মোবাইল ফোন নম্বরে বিকাশে ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠিয়েছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে তার অনেকগুলো নম্বর বিদেশ থেকে কুরিয়ারে আসা বোমা, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম, ধারালো অস্ত্র বহনকারী পার্সেলের ওপরে উল্লেখ ছিল। এ ছাড়া মৌলবাদী রাজনীতিতে জড়িত অনেকের সঙ্গে এসব ব্যক্তির যোগাযোগ আছে। বিস্তারিত তদন্তে বিদেশি চোরাকারবারিদের জঙ্গিবাদে অর্থ সরবরাহের নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। এ কাজে কয়েকটি দূতাবাসের কিছু ব্যক্তি জড়িত। বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি এদের সহযোগিতা করছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এনবিআরের বিভিন্ন গোয়েন্দা শাখা থেকে পাওয়া তথ্য সমন্বয় করে দেখা যায়, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী কিছু বিদেশি নিজের পরিচয় গোপন করে কৌশলে চোরাই পণ্যের ব্যবসা করে অর্থ পাচার এবং দেশের মধ্যে সন্ত্রাসে অর্থ সরবরাহ করছে। এসব ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুপারিশ করেছে এনবিআর। তিনি আরো বলেন, একসময় অভিযানে শুধু চোরাকারবারিদের এজেন্টদের আটক করা সম্ভব হতো।


মন্তব্য