kalerkantho


বাঘের চোখে চোখ রাখতেই...

কৌশিক দে, খুলনা   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের কবলে পড়েছিলেন কামাল হোসেন। জীবন নিয়ে ফিরতে পারলেও এখন আর জীবন চলছে না তাঁর।

কামাল বলছিলেন তাঁর বেঁচে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা, ‘প্রায় ১০ মিনিট বাঘটি আমার পেটের ওপর বসে থাকে। তখনো আমার জ্ঞান আছে। ওর চোখের সাথে নিজের চোখ রাখি। বাঘটি দুর্বল হয়ে পড়ে। হঠাৎই আমার বুকের ওপর থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে। ’

কিন্তু বাঘটি কামালকে ছেড়ে দেয়নি। বুকের ওপর থেকে নেমেই মাথা ও চোয়ালে থাবা বসায়। তবু সাহস হারাননি তিনি। বাঁ হাতে কাদা নিয়ে বাঘের চোখে ঢুকিয়ে দেন।

বাঘটি তখন পিছু হটে।

খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার কয়রা গ্রামের বাসিন্দা বনজীবী কামাল হোসেন (৩৮)। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘দিনটি ছিল ২০১১ সালের এপ্রিল মাস (এখন তারিখ মনে নেই)। আমি ও আমাদের গ্রামের রুহুল আমিন জঙ্গলে (সুন্দরবন) চালকি নদীর খালে পাটাজালে মাছ ধরতে যাই। সকাল ৭টার দিকে বনের মধ্যে হঠাৎ বাঘ লাফ দিয়ে আমারে খালের কাদার মধ্যে চেপে ধরে। ’

কামাল বলছিলেন, বাঘটি তাঁর বুকের ওপর উঠে বসার পরও তিনি জ্ঞান হারাননি। তার পরই তো বাঘের চোখে চোখ রেখেই বুদ্ধিবলে বেঁচে যাওয়া। বাঘের থাবার আঘাতে মাথা ও মুখের একাংশ ভীষণ রকম জখম হয়। তিনি বলেন, ‘সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। আমার সারা শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছিল। চোখে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছিল। কিন্তু তখনো আমার হুঁশ ছিল। ’

কামাল আরো বলেন, ‘সঙ্গী রুহুল আমিন আমাকে জায়গীরমহল হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার বাড়িতে খবর দেয়। ১০ দিন পর খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমাকে ভর্তি করা হয়। ১০৭ দিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরি। ’

রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি ঘটনা দেখে নির্বাক হয়ে যাই। কী করব কিছুই বুঝতি পারি নাই। বাঘ ওরে (কামাল) ছেড়ে গেলে ও চিৎকার শুরু করে। তখন কামালরে ১০০ ফুট দূরে থাকা নৌকায় তুলে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। কামাল বাঁচবে কোনোভাবেই মনে হয়নি। কিন্তু ও মনের জোরেই বেঁচে আছে। ’

বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে ফিরলেও পাঁচ বছর আগের ক্ষত আর যন্ত্রণা কামালকে এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে স্বাভাবিক হতে পারছেন না তিনি।

কামাল বলেন, ‘এখন বাম চোখে দেখতে পাই না। এখনো শরীরে তীব্র যন্ত্রণা হয়। বাম চোখে গভীর ক্ষত হওয়ায় এখন পুঁজ বের হয়। স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারি না। আমি সুস্থ হওয়ার জন্য একটু ভালো চিকিৎসা চাই। ’

কামাল জানান, রাকিব হোসেন (৮) ও সাকিব হোসেন (৫) নামের তাঁর দুই ছেলে রয়েছে। পরিবার নিয়ে এখন কষ্টে দিন কাটে তাঁর। তাঁদের জীবনধারণ বিভিন্ন মানুষ ও ইউনিয়ন পরিষদের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় সাংবাদিক হারুনুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাহসের কারণে হয়তো কামাল বেঁচে গেছেন। কিন্তু বাঘের হাত থেকে বাঁচলেও তাঁর শারীরিক সমস্যা রয়েছে। ভালো চিকিৎসা না পাওয়ায় এখনো শরীরে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। আমরা সমাজের দয়ালু মানুষের কাছে ওর জন্য সহযোগিতা চাই। ’


মন্তব্য