kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দক্ষিণখানে সিরিয়াল কিলার

সন্দেহে কয়েক যুবক, এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রাজধানীর দক্ষিণখানে একের পর এক মধ্যবয়সী গৃহকর্ত্রী খুনের ঘটনায় জড়িত যুবককে শনাক্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে পুলিশ ও র‍্যাবের একাধিক দল। গতকাল শনিবার পর্যন্ত এই দুর্ধর্ষ ‘সিরিয়ল কিলারকে’ শনাক্ত করতে পারেনি তারা।

তবে সন্দেহভাজন হিসেবে কয়েকজন যুবকের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এদিকে দক্ষিণখান এলাকায়ই ঘটনাগুলো ঘটায় এই এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, খুনি যুবককে শনাক্ত করার পাশাপাশি আর যেন কোনো ঘটনা না ঘটতে পারে সে জন্য কিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়িওয়ালাদের নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি সোর্স ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

পুলিশ ও এলাকাবাসী আলামত পেয়েছে, ভাড়াটিয়ার বেশে এক যুবকই বাসা দেখার নাম করে গত দেড় মাসে চারটি বাড়িতে একই কায়দায় হামলা চালায়। এসব ঘটনায় তিন নারী নিহত হয়েছেন। আহত হলেও বেঁচে গেছেন একজন। হামলার শিকার চারজনই বাড়ির মালিকের স্ত্রী ও মধ্যবয়সী। সর্বশেষ গত বুধবার বিকেলে গাওয়াইরের দক্ষিণপাড়ায় ওয়াহিদা আক্তার নামের এক নারীকে খুন করে ওই যুবক। পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে আগের তিনটি ঘটনাও ঘটিয়েছে ওই একই যুবক। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

দক্ষিণখান থানার ওসি সৈয়দ লুত্ফর রহমান গতকাল বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন উপায়ে তদন্ত করছি। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি থেকে পুরোপুরি চিহ্নিত করা যাচ্ছে না তাকে। তবে কয়েকজনকে আমরা সন্দেহের আওতায় এনেছি। আশা করছি দ্রুত সফল হব। ’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এমনভাবে চিহ্নিত হওয়ার আগেই কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেছে। এখন আমরা চাচ্ছি আর কোনো ঘটনা যেন না ঘটে। তাই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ’ এদিকে ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে র‍্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। র‍্যাব-১-এর অধিনায়ক  লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরাও কাজ করছি। আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, এক যুবকই চারটি ঘটনা ঘটিয়েছে। তার অবয়বও পাওয়া গেছে। তবে চেহারা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ’

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বুধবারের হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পুলিশ এলাকায় মাইকিং করে বাড়িওয়ালাদের সতর্ক করে। এরপর কমিউনিটি পুলিশ ও বিট পুলিশের মাধ্যমে বাড়িওয়ালাদের বিশেষ কৌশল অবলম্বনের কথা জানানো হয়। এলাকায় সোর্সও নিয়োগ করা হয়েছে। তবে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। কোনো বাড়িতে যুবক ভাড়া নিতে গেলেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে বাড়ির লোকজন। অনেক স্থানে যুবকদের ভাড়া দেওয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা জানায়, ২৫-২৬ বছরের এক সুদর্শন যুবক কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাসা দেখতে যাচ্ছে। বাড়িতে একা গৃহকর্ত্রী থাকলেই কেবল সে ভেতরে ঢোকে। সুযোগ বুঝে কাঁধের ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে পেছন দিক থেকে মহিলার ঘাড়ে ও গলায় আঘাত করে। এরপর দ্রুত সটকে পড়ে সামান্য কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে, যা গৃহকর্ত্রীর শরীরেই থাকে। আর কিছু সে নেয় না। গত বুধবার বিকেলে গাওয়াইরের দক্ষিণপাড়ার ৭১৫ নম্বর বাড়িতে ওয়াহিদা আক্তার নামের এক নারীকে খুন করে ওই যুবক। এর আগে গত ২৪ জুলাই দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইরে গৃহকর্ত্রী শাহিদা বেগমকে খুন করে তাঁর সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায় খুনি। ২১ আগস্ট পূর্ব মোল্লারটেকের তেঁতুলতলার ১১৪ নম্বর বাসার কর্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে একইভাবে হত্যা করা হয়। তৃতীয় ঘটনা ঘটে গত ৩১ আগস্ট। দক্ষিণ আজমপুরের এ ব্লকের ৩/এ রোডের ৮১/৩৯ নম্বর বাড়িতে জেবুন্নিসা চৌধুরীকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায় ওই ব্যক্তি। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া জেবুন্নিসা এখন ধানমণ্ডির গ্রিনলাইফ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এর আগে এক সিরিয়াল কিলার ধরা পড়ে ২০০৯ সালে, যার নাম রসু খাঁ। ১১ নিরীহ নারীকে ধারাবাহিকভাবে হত্যা করেছিল সে। ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণখানে সক্রিয় ওই যুবকও এক সিরিয়াল কিলার। সে কোনো কারণে মধ্যবয়সী বাড়ির কর্ত্রীকে কুপিয়ে খুন করছে। কোপানোর পর শরীরে থাকা সামান্য অলংকার নিয়ে যাচ্ছে ওই খুনি। কোপানোর ধরন, ধারালো অস্ত্র, খুনের লক্ষ্য—এগুলো প্রতিটির সঙ্গে মিল থাকায় খুনিকে ‘সিরিয়াল কিলার’ বলছে পুলিশও।


মন্তব্য