kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঈদ আনন্দযাত্রায় দুর্ভোগের মূলে পদ্মার দুই ঘাট

তৌফিক মারুফ   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঈদ করতে বরিশালের গৌরনদীতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন ঢাকার গার্মেন্টকর্মী কামাল হোসেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় বাসে ওঠেন।

প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টার পর শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বাসটি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে। তিনি বলেছিলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে, বাড়ি যাওয়া বাদ দিয়ে নেমে উল্টোপথে ঢাকায় ফিরে যাই। ঈদের আনন্দ যেন এই পদ্মায়ই ভেসে যাচ্ছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে এত কষ্ট করে ভ্রমণের কোনো মানে হয় না। ’

পদ্মা নদীর পাটুরিয়া ঘাটে গতকাল শনিবারও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। তবে এই নদীর আরেক প্রান্তে শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল।

নানা অনিয়মের কারণে গতকাল পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়েছে ঈদযাত্রীদের। কালের কণ্ঠ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আশরাফ-উল-আলম সরেজমিনে গিয়ে সকালে দেখতে পান দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পাঁচ শতাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায়। দুপুরে তিন শতাধিক বাস অপেক্ষায় ছিল পাটুরিয়া ঘাটে। ছোট গাড়ির সারি ছিল আরো দীর্ঘ। ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ধরে ফেরির অপেক্ষায় ছিল ঘরমুখো মানুষ। গত তিন দিন ধরে ফেরিঘাটে একই অবস্থা চলছে। প্রাইভেট কারচালক এনায়েত উল্লাহ জানান, গতকাল সকাল ৭টায় তাঁরা পাটুরিয়া পৌঁছেন, কিন্তু দুপুর ১২টায়ও নদী পার হতে পারেননি।

ফরিদপুরের একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডা. সাব্বির আহমেদ বলেন, গত শুক্রবার ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরিতে উঠতে পেরেছিলেন। তাঁরা মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি যান।

ফেরিঘাটে দেখা গেছে, বাসসহ বড় গাড়ির একটি এবং প্রাইভেট ও মাইক্রোবাসের জন্য আরেকটি সারি করা হয়েছে। পাটুরিয়া টার্মিনাল থেকে সরাসরি ফেরিঘাটে যাচ্ছে বাস। আর ছোট গাড়িগুলোকে নালী বাজারের সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকতে হয়। ওই সারিতে রিকশা ও ভ্যান চলাচল করায় গাড়িগুলোকে যানজটে পড়তে হয়। দুপুর ১টার দিকে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের শাহজাহান কবির বলেন, তাঁরা সকাল ৯টায় প্রাইভেট কার নিয়ে ঘাটে পৌঁছেছেন। এখনো আড়াই শ গাড়ির পেছনে রয়েছেন তাঁরা। তিনি বলেন, আধঘণ্টা পর পর  ছোট গাড়ির লাইন থেকে পাঁচ-সাতটি করে গাড়ি ছাড়া হয় ফেরিতে ওঠার জন্য। প্রাইভেট কারের তিনটি সারি করা হয়েছে। তিন সারিতে কমপক্ষে দেড় হাজার গাড়ি হবে বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ি দৌলতদিয়া ঘাটে নদী পারের অপেক্ষায় আটকা পড়ে। ফেরিঘাটের জিরোপয়েন্ট থেকে দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ ফিডমিল এলাকার পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির সারি দেখা গেছে। গতকাল দুপুরে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পরিদর্শনকালে বলেছেন, ‘তীব্র স্রোত ও ভাঙনের কারণে ঘাট রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা যতই মেরামত করার চেষ্টা করছি, প্রচণ্ড স্রোতের কারণে তা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। ’

অন্যদিকে ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত নতুন এই ফেরিরুট মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার শিমুলিয়ায় শুক্রবার ঈদে ঘরমুখো মানুষকে পড়তে হয়েছে সীমাহীন ভোগান্তিতে। ঢাকা থেকে মাত্র ৩৫ মিনিটের সড়কপথ পাড়ি দিয়ে শ্রীনগরে পৌঁছাতে পারলে ফেরিতে উঠতে বাকি থাকে পাঁচ মিনিটের পথ। ওইটুকু পথ পেরোতেই বাসের লেগে যায় তিন-চার ঘণ্টা। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ বা স্পিডবোটে পার হতে পারলেও যাদের সঙ্গে মালপত্র ও নারী-শিশু ছিল তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছে ফেরির অপেক্ষায়। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েও অনেকে একইভাবে আটকা পড়ে ঘাটে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার স্কুল শিক্ষক কাওসার হোসেন মাদারীপুরের কালকিনি যাওয়ার জন্য হাজারো যাত্রীর মতো প্রায় চার ঘণ্টা আটকে ছিলেন শিমুলিয়া ঘাটে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোন দুঃখে যে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম, বুঝতে পারছি না। আনন্দ করার জন্য যদি এত ভোগান্তি সইতে হয়, সেই আনন্দের কোনো সার্থকতা থাকে না। ’ তিনি বলেন, প্রতিবার ঈদের সময়ই এই পদ্মায় এসে নানা অজুহাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এর কি কোনো সুরাহা নেই? তবে গতকাল এই ঘাটে এমন চিত্র দেখা যায়নি। সকালে একটু চাপ থাকলেও বিকেলে স্বাভাবিক হয়ে আসে। অবশ্য অন্যপারে অর্থাৎ মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি ঘাটে তীব্র যানজট হয়। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের শিবচর-কাওড়াকান্দি থেকে পাচ্চর এলাকা পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কজুড়ে এলোমেলোভাবে গাড়ির সারি দেখা গেছে। এ কারণে ঢাকা থেকে আসা গাড়ি আটকা পড়ে। এ ছাড়া যারা ফেরি পার হয়ে এপারে এসে আরেকটি গাড়িতে করে গন্তব্যে যায় তাদের ফেরি থেকে নেমে অনেক দূর পায়ে হেঁটে গাড়িতে উঠতে হয়েছে।

কাওড়াকান্দি ঘাটে পারাপারের অপেক্ষা থাকা এক গরু ব্যবসায়ী জানান, তিন দিন ধরে ট্রাকে গরু নিয়ে বসে আছেন তিনি। গরুর খাবারও প্রায় শেষ। সময়মতো গরু নিয়ে বাজারে যেতে না পারলে বিক্রি হবে না। তাঁকে পথে বসতে হবে।

বিআইডাব্লিউটিসি সূত্রে জানা যায়, দ্রুত পারাপারের সুবিধার জন্য বাসের মালিকদের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছিল ফেরিতে বাস না উঠিয়ে কেবল যাত্রী পারাপার করে দেওয়ার জন্য। এ ক্ষেত্রে একই বাস কম্পানি নদীর দুই পারেই বাস তৈরি রাখবে নির্ধারিত যাত্রীদের জন্য, যেমনটা আগে পারাপার করা হতো বা এখনো কোনো কোনো রুটে হচ্ছে। কিন্তু বাস মালিকরা ওই অনুরোধ মানতে চান না।

দুই ঘাটের ফেরি পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডাব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরাও যাত্রীদের ভোগান্তি নিয়ে উত্কণ্ঠায় আছি। বলতে পারেন গত কয়েক দিন ধরে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আমি নিজে থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী রাত-দিন ছুটছি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নদীতে। এ নদীর অস্বাভাবিক স্রোত আর ঘাটে ভাঙনের ফলে ফেরি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। কোনো কোনোটি শক্তিশালী স্রোত কেটে একেবারেই চালানো যায় না, আবার যে রো রো ফেরিগুলো চালানো হয় সেগুলোও অনেক বেশি সময় নেয় গন্তব্যে যেতে। ’

এ প্রতিবেদন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন সাব্বিরুল ইসলাম সাবু (মানিকগঞ্জ), মো. মাসুদ খান (মুন্সীগঞ্জ), আয়শা সিদ্দিকা আকাশী (মাদারীপুর) ও গণেশ চন্দ্র পাল (গোয়ালন্দ)।


মন্তব্য