kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুই জঙ্গি দম্পতি গ্রেপ্তার

বিশেষ অ্যাপসে জঙ্গি নেটওয়ার্ক

এস এম আজাদ   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মোবাইল ফোনের বিশেষ অ্যাপস টেলিগ্রাম, থ্রিমা ও ফ্রিডম বিপিএন ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন ধারার সদস্যরা। গ্রেপ্তারকৃত দুই জঙ্গি দম্পতিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পেয়েছে র‍্যাব।

এ ছাড়া তরুণ-তরুণীদের মোবাইল ফোন প্রযুক্তির মাধ্যমে জঙ্গিবাদে উসকে দিচ্ছে—এমন একটি জঙ্গি গ্রুপ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার ফার্মগেট ও নারায়ণগঞ্জের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত দুই জঙ্গি দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র‍্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দেওয়া চক্রের অন্তত ১১ জনকে খুঁজছেন তাঁরা। তারা হলো মিজান, খলিল, মিলন, নিলয়, আফিফ, কাইফ, জাইশান, মফিজ, প্রিন্স ফাহিম, হৃদয় ও আবু আলী।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই নারীসহ চার জঙ্গির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তাদের সহযোগী ও নির্দেশদাতা জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।  

মঙ্গলবার রাতে ফার্মগেট থেকে মারজিয়া আক্তার সুমি ও তাঁর স্বামী শরিফুল ইসলাম ওরফে সুলতান মাহমুদ তাপস ওরফে মাহমুদ এবং ফতুল্লা থেকে নাহিদ সুলতানা ও তাঁর স্বামী আমিনুল ইসলামকে আটক করে র‍্যাব-২। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তাঁরা নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

গত বুধবার দুই জঙ্গি দম্পতিকে শেরে বাংলানগর থানায় হস্তান্তর করে র‍্যাব-২। ওই দিন তাঁদের ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত নাহিদা ও সুমির পাঁচ দিনের এবং আমিনুল ও মাহমুদের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাঁরা এখন শেরে বাংলানগর পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, শেরে বাংলানগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সাব্বির আহমেদ বলেন, দুই দিনের জিজ্ঞাসাবাদে এখনো তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

তবে র‍্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুল জানিয়েছেন, চলতি বছরের মার্চে উত্তরার আজমপুর ঈদগাহ ছাপরা মসজিদে তিনি জঙ্গি মিজানের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে আরো অন্তত ১০ নতুন জঙ্গি ছিল। মিজান তখন নিজের মোবাইল ফোন থেকে ‘শেয়ার ইট’ অ্যাপের মাধ্যমে টেলিগ্রাম, থ্রিমা ও ফ্রিডম বিপিএন অ্যাপ শরিফুলের মোবাইলে স্থানান্তর করেন। ওই সব অ্যাপসে শরিফুলের অ্যাকাউন্টও খুলে দেওয়া হয়।   

জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুলের স্ত্রী সুমি জানান, প্রথমে ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি জেএমবির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ফলে থ্রিমা ও টেলিগ্রাম অ্যাপসের পৃথক দুটি জেএমবি গ্রুপে যুক্ত হন। ‘নব্য জেএমবি’র এই গ্রুপ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী অফিশিয়াল গ্রুপের হিজরত শাখাটি ‘তালিফ’ নামে পরিচালনা করা হয়। এ গ্রুপ থেকেই আফিফ, কাইফ, জাইশান, মফিজসহ অনেকের সঙ্গে সুমির কথা হয়।

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, নব্য জেএমবির সদস্যরা এখন বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। টেলিগ্রাম অ্যাপে জেএমবি সদস্যদের অনেক গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে টাইফুন গ্রুপের শীর্ষ চার জঙ্গির নাম জানা গেছে। তাঁরা হলেন মিজান, খলিল, মিলন ও নিলয়। টাইফুন গ্রুপের কিছু উপগ্রুপও রয়েছে। সেগুলো হলো—আনসার, নাছিদ, কোরআন তিলাওয়াত, ফিকাহ, কিতালে, গোয়েন্দা, অনুবাদ ও সম্পাদনা। প্রতি গ্রুপের একজন আমির আছে এবং সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২।

জেএমবি জঙ্গি মিজানের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় শরিফুলের। পরে মিজানের মাধ্যমে টেলিগ্রামের উপগ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হন শরিফুল। মিজানের টেলিগ্রাম আইডি ‘দুষ্টু ছেলে’ এবং ফেসবুক আইডি ‘সবুজ পাখি’। কিছুদিন পর অনুবাদ গ্রুপ থেকে তিন-চারজনকে বাদ দেওয়া হয়। তখন জঙ্গি খলিল তাঁকে গোয়েন্দা উপগ্রুপে যুক্ত করে নেন। এ গ্রুপেই তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় নিজ এলাকার নাস্তিকদের নাম-ঠিকানা দিয়ে একটি তালিকা করার জন্য। পরে চলতি বছরের রমজানে ওই গ্রুপে জানতে চাওয়া হয়, মৃত্যুর জন্য বায়াত নিতে কে কে প্রস্তুত আছে? এ সময় মিজান, প্রিন্স ফাহিম, হৃদয়, আবু আলীসহ ২০-২৫ জন রাজি হয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রিন্স ফাহিম বা ফয়জুল্লাহ ফাহিমসহ কয়েকজন মাদারীপুরে এক হিন্দু শিক্ষককে হত্যা করতে যায়। সেখানে ফাহিম ধরা পড়ে ও পরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দুই জঙ্গি দম্পতির মামলাটি র‍্যাবের হাতে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। আশা করি, আগামী শনিবারের মধ্যে মামলাটি হয়তো র‍্যাবের হাতে চলে আসবে। ’


মন্তব্য