kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে মোটাতাজা গরু রংপুরের হাটে!

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে দেশি গরু মোটাতাজা করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এভাবে প্রায় তিন লাখ গরুকে ক্ষতিকর স্টেরয়েট ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়েছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খামারিরা এসব গরু হাটে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন হাটে এসব গরু দেখা গেছে। তবে কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণ বন্ধে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, খামারিসহ অসাধু ব্যবসায়ীরা কোরবানির ঈদের চার থেকে পাঁচ মাস আগে গরু কম দামে কিনে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকদ্রব্য খাইয়ে মোটাতাজা করে। বিভাগের আট জেলায় ২০ হাজারের মতো মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খামারি মিশন নিয়ে এসব বড় গরু হাটে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বেশ কয়েকটি খামার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিক লাভের আশায় তারা ওষুধ খাইয়ে কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজা করছে। এই জাতীয় ওষুধ খাওয়ালে গরু দেহে অধিক মাত্রায় পানি ধারণ করতে পারে। এতে করে গরুর শরীর ফুলেফেঁপে ওঠে। অল্প সময়ে গরু মোটা হয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কিছু ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে জানায়, এ জাতীয় ওষুধ ভারত থেকে সীমান্ত পথে দেশে নিয়ে আসছে চোরাকারবারিরা। আর তা সরাসরি চলে যাচ্ছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের হাতে। এরই মধ্যে দিনাজপুরে বিজিবি গরু মোটাতাজাকরণের বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ভারতীয় ওষুধ জব্দ করেছে।

রংপুরের গরু ব্যবসায়ী রহমত আলী, জসিম মিয়া, ছালাম শেখসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কোরবানির ঈদের তিন থেকে চার মাস আগে কম দামে গরু কিনে তাঁরা লালন-পালন করেন এবং স্টেরয়েডসহ বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ানোসহ হরমোন দিয়ে মোটাতাজা করেন। এতে অল্প দিনে লাভ ভালো পাওয়া যায়। এ ধরনের ব্যবসায়ীরা গড়ে পাঁচ থেকে ১০টি গরু লালন-পালন করেন। এসব ব্যবসায়ীর বিষয়ে প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ কিছুই জানে না। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব অসাধু ব্যবসায়ী কোরবানির ঈদের ঠিক আগে বাড়তি দামের আশায় গরু বিক্রি করে দেন।

তবে প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, তাদের কাছ থেকে যেসব খামারি প্রশিক্ষণ নিয়েছে তারা কোনো ক্ষতিকর পদার্থ গরুকে খাওয়াচ্ছে না। তারা ঈদে কিছু লাভের আশায় অনেক আগে কম দামে গরু কিনে লালন-পালন করে। সরকারিভাবেও গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প চালু রয়েছে। এসব প্রকল্পে স্বাভাবিক খাদ্য খাইয়ে গরু মোটাতাজা করা হয় বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

তবে প্রাণিসম্পদ বিভাগ স্বীকার করেছে, কিছু অসাধু মৌসুমি ব্যবসায়ী গরুকে মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খাওয়াচ্ছে। গরুকে ক্ষতিকারক নানা ধরনের ওষুধ খাইয়ে মোটাতাজা করে বাজারজাতকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষ থেকে।

এরই মধ্যে সব জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাটগুলোতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা গরু যাতে বিক্রি করতে না পারে তা মনিটরিং করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রংপুর বিভাগের রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে আট লাখের বেশি গরু। যদিও চাহিদা রয়েছে ছয় লাখের ওপর। বাড়তি গরু অন্যান্য এলাকায় চলে যাবে। এ ছাড়া বিভাগে গরু রয়েছে ৭০ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৪টি। মহিষ রয়েছে এক লাখ ৩৪৫টি। ছাগল রয়েছে ৪১ লাখ ২০ হাজার ৪০৬টি। দুগ্ধ খামার রয়েছে পাঁচ হাজার ৩৮৫টি।

এ ব্যাপারে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. সরোয়ার আলম বলেন, ‘গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত স্টেরয়েড ট্যাবলেট মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা গরু দেখতে সুন্দর হলেও এসব গরুর মাংস খেলে লিভার ও কিডনির সমস্যাসহ মানুষের দেহে নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর মাংস না খাওয়াই ভালো।

রংপুর আঞ্চলিক প্রাণিসম্পদ বিভাগের উপপরিচালক ডা. স্বপন কুমার পাল বলেন, ‘কোরবানির জন্য এবার গরুর কোনো ঘাটতি নেই। স্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা করা গরুই বাড়তি রয়েছে। ক্ষতিকারক স্টেরয়েড ট্যাবলেট ও হরমোনসহ নানা ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ খাইয়ে গরু  মোটাতাজাকরণের পর বাজারজাতকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ’


মন্তব্য