kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢাকার প্রাচীনতম পশুর হাট

আপেল মাহমুদ   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকার প্রাচীনতম পশুর হাট

গাবতলী : ষাটের দশকে গাবতলী গবাদি পশুর হাটের একটি চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঈদুল আজহার সময়টাতে রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলো নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে যায়। গণমাধ্যমেও স্থান পায় হাটের কুষ্ঠি-রাশির নানা গালগল্প।

দেশি গাভি থেকে শুরু করে হরিয়ানার লম্বা শিংওয়ালা গরু কিংবা মিরকাদিমের ধবধবে সাদা গাই এবং রাজস্থানি উট ও সৌদি আরবের দুম্বা কেনার প্রতিযোগিতাও চলে। ধর্মীয় অনুভূতি আর ভাবগাম্ভীর্য ছাপিয়ে কে কত বড় পশু কোরবানি দিতে পারে সেটাই যেন মুখ্য হয়ে ওঠে। আর এসব পশু কেনা হয় রাজধানীর স্থায়ী পশুর হাট গাবতলীসহ কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বসা অস্থায়ী বিভিন্ন হাট থেকেই। আর এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে এসব হাটের মধ্যে আজও সেরা প্রায় শত বছরের গাবতলীর পশুর হাট।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, গাবতলীর পশুর হাটটি উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রতিষ্ঠিত। এটাকে নগরীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক পশুর হাট বলা হয়। কারণ এর আগে ঢাকায় তেমনভাবে আর কোনো স্থায়ী পশুর হাট বসেনি। ঢাকাবিষয়ক ইতিহাস গ্রন্থ ঘেঁটে গাবতলীর পশুর হাট সম্পর্কে বলতে গেলে কোনো তথ্যই মেলেনি। তবে এই এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন গবাদি পশুর হাট হিসেবে নরসিংদীর পুইট্টা হাটের বিবরণ পাওয়া যায় যতীন্দ্রমোহন রায়ের ঢাকার ইতিহাস গ্রন্থে।

গাবতলীর পশুর হাট বসানোর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব মিরপুরের জমিদার মুন্সী লাল মিয়ার। গাবতলীর গবাদি পশুর হাটের অতীত জানালেন মুন্সী লাল মিয়ার নাতি মিয়া মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন। বললেন, ‘মুন্সী লাল মিয়া ১৯১৮ সালে প্র্রতিষ্ঠা করেন গাবতলী পশুর হাট। তখন সপ্তাহে এক দিন শনিবারে এই হাট বসত। তখনকার হাট অবশ্য বর্তমান জায়গায় ছিল না। সেটি বসত মিরপুর মাজার রোডের দুই পাশে। এখানকার বাসিন্দা বর্ষীয়ান কেফায়েৎ উল্লাহ গাজী বলেন, ‘শুধু ঢাকা নয়, হাট শুরুর সময় থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকার লোকজন কোরবানির পশু কিনতে গাবতলীতে চলে আসতেন। সাভার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, দোহার, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদী এলাকার মানুষ ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ হেঁটে গাবতলী থেকে পশু কিনে বাড়ি ফিরতেন। মূলত কম দামে পছন্দসই পশু গাবতলীতে পাওয়া যেত বলেই দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা সেখানে আসত। অতীতে পশুর হাটটি ওয়াকফ্ এস্টেটের অধীনে চললেও পরবর্তী সময়ে সেটি সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ’

লর্ড কারমাইকেল রোডের বাসিন্দা আব্দুল হক মিয়া জানান, মুন্সি লাল মিয়া এস্টেটের আয়ের বড় একটা উৎস ছিল গাবতলীর গবাদি পশুর হাট। ১৯৭৩ সালে হাটটি সরকার জাতীয়করণ করে। মূলত তখন থেকেই সপ্তাহের পরিবর্তে প্রতিদিন এখানে হাট বসতে শুরু করে।   বদলে যায় হাসিল আদায়ের প্রথা। হাটের শুরুর দিকে গরুপ্রতি চার আনা হাসিল আদায় করা হতো। ওয়াক্ফ এস্টেটের আওতায় থাকার শেষ দিকে যা এক টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

পুরান ঢাকার বর্ষীয়ান দৌলত উল্লাহ বক্স বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা দলবেঁধে গাবতলীর হাটে যেতাম। প্রতিবছরই সেটা একটা উৎসবে পরিণত হতো। আর ঢাকায় কোরবানির পশুর হাট বলতে গাবতলীকেই বুঝাত। কারণ তখন পাড়া-মহল্লায় পশুর হাট বসত না। শহরে তেমন কোনো গাড়ি-ঘোড়াও চলত না। সে কারণে সবাই ১০-১৫ কিলোমিটার হেঁটেই গাবতলীতে যেতেন। ’

গাবতলী পশুর হাটটি বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে অন্যতম বৃহৎ গবাদি পশুর হাট। এখান থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা আয় হচ্ছে। করপোরেশনের তথ্য নির্দেশিকায় হাটের নাম মিরপুর গাবতলী গবাদি পশুর হাট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। হাটের একাধিক ব্যবসায়ী জানায়, ১৯৭৩ সালে এই হাট পরিচালনার ভার পায় মিরপুর ইউনিয়ন। তখন ঢাকা ছিল একটি পৌরসভা। ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে সেই পৌরসভা গঠিত হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে মিরপুরকে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত পৌরসভার আওতায় পরিচালিত হয় হাটটি। ওই বছরই একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেঙে যায় গাবতলী গবাদি পশুর হাট।

মিরপুরের স্থানীয় লোকজন জানায়, ১৯৮৬ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) উদ্যোগে তুরাগ নদের তীরবর্তী বর্তমান জায়গায় গবাদি পশুর হাটটির কার্যক্রম শুরু হয়। এখন পর্যন্ত সেটিই দেশের বৃহৎ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত।


মন্তব্য