kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘তাঁয় য্যান যুগ যুগ ধরি বাঁচি থাকে’

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘তাঁয় য্যান যুগ যুগ ধরি বাঁচি থাকে’

কুড়িগ্রামে ১০ টাকা কেজি দরে দরিদ্র মানুষের মাঝে গতকাল চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিআইডি

‘১০ টাকা কেজি দরে চাউল দিয়া শেখের বেটি হাসিনা হামার খুব উপকার করিল। তাঁয় য্যান যুগ যুগ ধরি বাঁচি থাকে।

’ ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র আওতায় সস্তায় চাল পেয়ে এভাবেই অনুভূতি ব্যক্ত করেন চিলমারী সদরের আকন্দপাড়া গ্রামের বিধবা হালিমা খাতুন। তাঁর অন্ধ স্বামী আর ছোট একটি সন্তান নিয়ে বড় অভাবে আছে তাঁর সংসার।

গতকাল বুধবার কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা সদরের থানাহাট এইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রধানমন্ত্রী ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি নিজ হাতে ১৫ জনের কাছে ১০ টাকা কেজি দরের চাল ও খাদ্যবান্ধব কার্ড বিতরণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চাল পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত এমন অনেকেই।

দরিদ্র হালিমার সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। কোনো দিন এক বেলা, কোনো দিন দুই বেলা জুটত আহার। এবার মাসে মাত্র ৩০০ টাকায় ৩০ কেজি চাল পাবেন—এমনটা আশা করেননি তিনি। হালিমা বলেন, ‘আগের সরকারগুলা হামাক তেমন কিছুই দেয় নাই। এবার বানের সময় তেল, নুন, টাকা সউগ দিছে। দোয়া করি তাঁয় (শেখ হাসিনা) য্যান বাঁচি থাকে। তাঁয় থাকলে মানুষ খুব উপকার পাইবে। ’

হালিমার সঙ্গে চালের বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর ফাতেমা বেগমের আনন্দটা অন্য রকম। অভাবনীয় সস্তায় চাল পাওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে এই চালের বস্তাটি পেয়ে ধন্য তিনি। বলেন, ‘হামরা শেক হাসিনাক দেখি নাই কোনো দিন। হামার দুঃখের কথা চিন্তা করি তাঁয় যে কামটা করিল। হামরা তাঁক খুব মনে রাখমো বাহে। ’

জাহাঙ্গীর, আবু বক্কর সিদ্দিক, আব্দুল খালেক, আজিজুল হকসহ যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চাল পেয়েছেন, তাঁরাই খুশিতে আত্মহারা। তাঁরা জানান, নদীভাঙা চরাঞ্চলে এমনিতেই সারা বছর কাজের অভাব লেগে থাকে। বর্ষা ও বন্যায় কর্মসংকট আরো প্রকট হয়। তবে ধান লাগানো ও কাটার আগের সময়টায় তেমন কাজ থাকে না। অনেকেই ধার-দেনা করে চলেন। কেউ কাজের সন্ধানে বাইরে যান। এ সময় অনেকের ঘরে চাল থাকে না। হাতে থাকে না টাকাও। এ অবস্থায় ১০ টাকা কেজির চাল তাঁদের খাদ্যসংকট মেটাতে সাহায্য করবে। মাত্র এক-দুই দিনের রোজগারের টাকায় ৩০ কেজি চাল পাওয়ার ঘটনাটিকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন থানাপাড়ার দিনমজুর আবু বক্কর।

১০ টাকায় চাল দিতে প্রধানমন্ত্রী আসছেন—এ খবরে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে এসেছে বহু দরিদ্র মানুষ। তবে সভাস্থলে সবাই ঢুকতে না পারলেও রাস্তায়, বাঁধে, গাছতলায় বসে তাদের আলোচনা করতে দেখা গেছে। অনেকে প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এলেও তা সম্ভব হয়নি

চালের বস্তা মাথায় নিয়ে চিলমারী উপজেলা পরিষদ চত্বর হয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন বিধবা দেয়ারা বেওয়া। তাঁকে থামিয়ে ছবি তুলতে গেলে অভাবী মুখে ফুটে ওঠে হাসির ঝিলিক। মণ্ডলপাড়া গ্রামের দেয়ারা বেওয়ার পাঁচজনের সংসারে এক ছেলেই কেবল উপার্জন করে; কিন্তু বন্যার সময় থেকে কাজ না পাওয়ায় বড় কষ্টে দিন যাপন করছিলেন। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে চাল দেবেন শুনে খুশিতে দুই দিন ধরে প্রায় নির্ঘুম রাত কেটেছে তাঁর।

চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম বলেন, ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় এই চিলমারীর জেলেপাড়ার বাসন্তীকে জাল পরিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বঙ্গবন্ধুকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হয়েছিল। বোঝানো হয়েছিল, চিলমারী আর কুড়িগ্রাম মঙ্গার এলাকা। সেই মঙ্গা আর নেই। তবে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ১০ টাকা কেজিতে চাল দিয়ে তাঁর কথা রেখেছেন। চিলমারীর নদীভাঙা হতদরিদ্র মানুষের কাছে এসে তিনি এ কর্মসূচি উদ্বোধন করায় দরিদ্র মানুষ খুব খুশি হয়েছে। ’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় মোট এক লাখ ২৫ হাজার ২৭৯টি পরিবার খাদ্যবান্ধব কার্ডের মাধ্যমে সরকারের সৃজনশীল এই কর্মসূচির সুফল পাবে। চাল বিক্রির জন্য জেলায় ২৪৭ জন সম্ভাব্য ডিলারের মধ্যে ১২৬ জনকে এরই মধ্যে নিযুক্ত করা হয়েছে।


মন্তব্য