kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশের দারিদ্র্য জয়ের গল্প শুনবে বিশ্ব

১৭ অক্টোবর দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উপলক্ষে আসছেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট

আরিফুর রহমান   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ এখন এক অনুকরণীয় নাম। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনসহ দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যের স্বীকৃতি মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান, অমর্ত্য সেন, কৌশিক বসুসহ বড় বড় অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০১০—এই ১০ বছরে এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২০০০ সালে দেশে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৬০ শতাংশের কাছাকাছি, সেটি এখন ২৩ শতাংশের ঘরে। শুধু তাই নয়, গড় আয়ু, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু হার, সর্বজনীন শিক্ষা, পয়োনিষ্কাশনসহ সামাজিক সূচকগুলোতে এরই মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের এই ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ নজরে এসেছে জাতিসংঘেরও। তাই আগামী ১৭ অক্টোবরের বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবসটি এ দেশেই উদ্‌যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। ওই দিন বাংলাদেশের সাফল্যের গল্প শুনবে পুরো বিশ্ব। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার সাফল্যের রহস্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর র‌্যাডিসন হোটেলে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা রয়েছে। আর সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৬ অক্টোবর আসছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। সঙ্গে আরেকজন প্রখ্যাত ব্যক্তিকে আনার চেষ্টা চলছে। তাতে নাম রয়েছে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ নিকোলাস স্টার্নের।

১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিবছর দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালন করে আসছে জাতিসংঘ। সাধারণত যেসব দেশের দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা প্রশংসনীয়, ওই সব দেশেই দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন সম্পর্কে বক্তব্য দেবেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট দক্ষিণ কোরীয় বংশোদ্ভূত জিম ইয়ং কিম। বাংলাদেশ নিয়ে আগামীতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলবেন তিনি। তিন দিনের (১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর) এই সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র বাস্তবায়ন, তিন বছর মেয়াদি সহযোগিতার কৌশলপত্রসহ (আইডিএ ১৮) বিশ্বব্যাংক কোন কোন খাতে সহযোগিতা করতে চায় সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সর্বশেষ ২০০৭ সালে রবার্ট জোয়েলিক দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন।

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে আসার কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, তিন কারণে এ হার দ্রুত কমে এসেছে। প্রথমত গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। আর তৃতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বেড়েছে। ড. আলম বলেন, গত ছয়-সাত বছরে গ্রামাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। দেশের অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০০৫ সালে দেশে ১৩ শতাংশ পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ছিল। সেটি এখন বেড়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কিছুটা টানাপড়েন তৈরি হলেও সেটিকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চায় বিশ্বব্যাংক। তার অংশ হিসেবে প্রতিবছরই বাংলাদেশে অর্থায়ন বাড়ানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা যে ভুল ছিল, সেটি এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার এবং এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। এবারের দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা হবে বলেও জানান কর্মকর্তারা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ ধরনের ইতিবাচক বক্তব্য এলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের সামনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বাংলাদেশ।

জানতে চাইলে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিক দিয়ে ভারত থেকে পিছিয়ে থাকলেও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক আগেই দেশটিকে ছাড়িয়ে গেছে। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, প্রাথমিক শিক্ষাসহ সামাজিক সূচকগুলোতে এরই মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। জিম ইয়ং কিম এসব সাফল্যের কথা তুলে ধরবেন।

তবে অনুষ্ঠানে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে মূল প্রবন্ধ কে উপস্থাপন করবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অমর্ত্য সেন, জুলিয়া গিলার্ড ও নিকোলাস স্টার্ন—এ তিনজনের মধ্যে কে বাংলাদেশে আসবেন তা এখনো ঠিক করা হয়নি। অবশ্য অমর্ত্য সেন অক্টোবরে কোথাও যান না—এমন তথ্য জানা গেছে। ফলে জুলিয়া গিলার্ড ও নিকোলাস স্টার্নের মধ্যে একজন আসতে পারেন বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা।


মন্তব্য