kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ

ফরেনসিক বিভাগে বিশেষজ্ঞ সংকট

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফরেনসিক বিভাগে বিশেষজ্ঞ সংকট

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে অধ্যাপকের একমাত্র পদটি শূন্য আট বছর ধরে। আর তিন মাস ধরে শূন্য সহকারী অধ্যাপকের পদটি।

সহকারী অধ্যাপক পদে ছিলেন ডা. সুমন মুত্সুদ্দী। তাঁকে গত ৩১ মে কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজে বদলি করা হয়েছে।

বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. কাশেম গত ২৮ আগস্ট হজে গেছেন। তিনি ৪৫ দিনের ছুটিতে।

ফলে এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তিনটি পদে কেউ নেই।

আগামী বছরের মাঝামাঝিতে পিআরএলে (অবসর) যাচ্ছেন ডা. সৈয়দ মো. কাশেম। এতে বিভাগটিতে আরো সংকট তৈরি হবে।

বর্তমানে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে চারজন প্রভাষক ও মেডিক্যাল অফিসার আছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন প্রভাষক। তাঁদের কারো ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে উচ্চতর (এমডি) এবং ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেই। ফরেনসিকের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণও নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবসহ নানামুখী সংকটে ফরেনসিক মর্গে ময়নাতদন্ত, মেডিকোলিগ্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মর্গ ও শ্রেণি কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, এমবিবিএস পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে হিমশিম খেতে হচ্ছে কলেজ কর্তৃপক্ষকে। সে কারণে আগামী ২ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষার ফরেনসিক বিষয়ে  মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নিতে অন্য কলেজ থেকে শিক্ষক আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে জনবল সংকট যে প্রকট সেটা স্বীকার করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফরেনসিক বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে লোকবল সংকট প্রকট। মর্গে ময়নাতদন্ত কার্যক্রম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হলে রিপোর্ট আরো বেশি ভালো হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকলে খুব জটিল ময়নাতদন্ত করার সময় হিমশিম খেতে হয়। প্রভাষক ও মেডিক্যাল অফিসাররা করলেও ময়নাতদন্ত রিপোর্টে কোনো সমস্যা নেই। ফরেনসিক মর্গসহ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয়। একটু ভুলভ্রান্তি হলে অনেকের ক্ষতি হয়ে যায়। সে কারণে ফরেনসিকের ওপর উচ্চ ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের বেশি প্রয়োজন। ’

ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘লোকবল সংকট থাকলেও আমাদের কোনো কার্যক্রম থেমে নেই। লোকবল সংকটের বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। আশা করি সমাধান হবে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় নিহতদের অনেকের মরদেহ ময়নাতদন্ত হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক মর্গে। জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত হলেও জটিলতা থাকলে সেখান থেকে মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। বছরে প্রায় আড়াই হাজার ময়নাতদন্ত হয় এখানে। এই মর্গে ময়নাতদন্ত কাজে সরকারিভাবে ডোমের কোনো পদ নেই। স্থানীয় আদেশে বাইরে থেকে একজন লোক দিয়ে মরদেহের কাটাছেঁড়ার কাজ চালাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। মামলা-মোকদ্দমার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিচ্ছেন প্রভাষক বা মেডিক্যাল অফিসাররা।

ময়নাতদন্তের পাশাপাশি ফরেনসিক বিভাগে ধর্ষণ, বয়স, বলাত্কার, বিবাহিত নারী-পুরুষের যৌন সক্ষমতাসহ মেডিকোলিগ্যাল বিভিন্ন পরীক্ষা হয়। গত ২৮ আগস্ট সহকারী অধ্যাপক ডা. সুমন বদলি হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রভাষক, মেডিক্যাল অফিসাররা এসব পরীক্ষা করছেন।

জানা যায়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে প্রতি শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। দ্বিতীয় পেশাগত ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে প্রভাষক পাঠদান করতে পারলেও পরীক্ষা নিতে পারেন না। শুধু লিখিত পরীক্ষা নয়, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও প্রভাষকদের অংশগ্রহণ করার নিয়ম নেই। পরীক্ষা নেন সহকারী অধ্যাপক থেকে উচ্চপদের শিক্ষকরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার এ কে এম মাহফুজুল হক বলেন, ‘আগামী ২ অক্টোবর থেকে এমবিবিএস দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু হবে। যেহেতু সহকারী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে শিক্ষক নেই, তাই আমরা অন্য মেডিক্যাল কলেজ থেকে ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল দিতে যাচ্ছি। প্রভাষকদের এমবিবিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রমে রাখা হয় না। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরেনসিক মর্গের একাধিক প্রভাষক বলেন, তাঁরা কাজ করলেও এ বিষয়ে তাঁদের এমডি (ফরেনসিক মেডিসিন) ডিগ্রি নেই। সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত যে পদগুলো রয়েছে সেখানে লোকবল চরম সংকট থাকায় তাঁরা ময়নাতদন্ত করেন না। এই কাজ করেন প্রভাষকরা ও মেডিক্যাল অফিসাররা। তবে যদি মেডিক্যাল বোর্ড হয় মাসে দু-একটা ময়নাতদন্ত করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৬ সালের পর থেকে নিয়মিত কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ময়নাতদন্ত করেননি।

ফরেনসিক বিভাগের এক প্রভাষক জানান, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে ধর্ষণ পরীক্ষা নারী চিকিৎসক দিয়ে করার। কিন্তু এখানে মেডিক্যাল অফিসার (নারী) আছেন মাত্র একজন। স্থায়ী কোনো পদ নেই। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক বিভিন্ন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর সাক্ষ্য দেওয়াসহ এত বেশি কার্যক্রম রয়েছে যা চারজন প্রভাষক ও মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। মানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিকল্প নেই বলে জানান ওই প্রভাষক।


মন্তব্য