kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাজশাহীতে ফিরেছে বিষধর সাপ চন্দ্রবোড়া

দংশনে দুই মাসে ১০ জনের মৃত্যু

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিষধর চন্দ্রবোড়া (রাসেল ভাইপার) সাপের আতঙ্কে রয়েছে রাজশাহীর পবা ও গোদাগাড়ীর পদ্মাতীরবর্তী এলাকার মানুষ। গত দুই মাসে এ সাপের দংশনে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছে আরো দুজন। স্থানীয় লোকজনের হাতে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫টি সাপ মারা পড়ছে। সাপ আতঙ্কে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ দিনের বেলা ফসলি মাঠে কাজে নামতে ভয় পাচ্ছে।

এই সাপের দংশনে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, বন্ধ হয় না। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘাড় অবশ হয়ে যায়। তবে এক ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা নিলে মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ সূত্র জানায়, ২০-২৫ বছর পর বিলুপ্তপ্রায় এ সাপ রাজশাহী অঞ্চলে ফের দেখা দেয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। ওই সময় জেলার তানোরের শিবরামপুর গ্রাম থেকে জার্মানির আন্তর্জাতিক বিষ গবেষণা কেন্দ্রের একটি দল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দুটি সাপ ধরে নিয়ে যায়। আর একটি সাপ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আজিজুল হক আজাদ নমুনা হিসেবে তাঁর কার্যালয়ে রেখে দেন। এরপর সাপগুলোকে রাসেল ভাইপার বলে চিহ্নিত করা হয়।

এ ব্যাপারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, রাসেল ভাইপার সাপ একসময় দেখা যেত; কিন্তু বর্তমানে এ দেশে বিলুপ্তপ্রায়। তবে কোনো না কোনোভাবে ভারত থেকে এ সাপ আসতে পারে। এ সাপে দংশনের এক ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা না দিলে মানুষ মারা যায়।

গোদাগাড়ীর বেনাবোনা এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল ইসলাম (১৯) চন্দ্রবোড়া সাপের দংশনে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। গত ২৮ আগস্ট দোকান থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এ সময় বাড়ির কাছে একটি সাপে দংশন করে তাঁকে। তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সাপটিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। পরে সাপসহ আহত জিয়ারুলকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

গতকাল শনিবার দুপুরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হামসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সাপের দংশনে জিয়ারুল ২৫ নম্বর বেডে শুয়ে আছেন। তাঁর আশপাশে বসে আছে পরিবারের লোকজন। একই হাসপাতালে ভর্তি আছে শিহাব উদ্দিন নামের আরেক কিশোর। দুজনই শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন মেডিসিন বিভাগের প্রধান খলিলুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, দ্রুত রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার কারণে বিষ গোটা শরীরে ছড়াতে পারেনি। সেই সঙ্গে সাপটিকেও চিহ্নিত করার কারণে রোগীর চিকিৎসা দিতে তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। ফলে বিপদমুক্ত হয়েছে তারা। তবে বিষধর এ সাপের দংশনে শরীরের বিষক্রিয়া এখনো পুরোপুরি যায়নি। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।

চিকিৎসক আজিজুল হক আজাদ জানান, প্রায় ২৫ বছর পর এই সাপ আবার দেখা যাচ্ছে। এ সাপে দংশন করলে দ্রুত মানুষের শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। চিকিৎসা দেওয়ার সময়ই পাওয়া যায় না। এ সাপ দুই-তিন ফুট লম্বা হয়। বছরে দুইবার ২০ থেকে ৩০টি করে ডিম দেয় এরা।

গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা এলাকার সাইফুল ইসলাম জানান, বর্ষা শুরু হওয়ার পরপরই গত দুই মাসে গোদাগাড়ী ও পার্শ্ববর্তী পবা উপজেলা মিলে অন্তত ১০ জন মারা গেছে রাসেল ভাইপারের দংশনে। দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিতে না পারায় এক, দুই ও তিন দিনের মাথায় সাপে দংশানো রোগীরা মারা গেছে।

বেনাবোনা এলাকার শামিউল ইসলাম জানান, শুষ্ক মৌসুমে সাপগুলো সাধারণত পদ্মার চরের জমি ও বিলের মধ্যে থাকে। কিন্তু বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে এরা আশ্রয় খোঁজার জন্য ওপরে উঠে আসে। এ কারণে পদ্মায় এবং বিলে পানি জমার ফলে সাপগুলো এখন জনবসতি এলাকায় ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে পদ্মাতীরবর্তী গ্রামগুলোতে এ সাপের ব্যাপক বিচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে।

প্রতিদিন পবার বেড়পাড়া, গহমাবনা, গোদাগাড়ীর নিমতলা, বেনাবোনা, আলীপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ২০-২৫টি করে রাসেল ভাইপার রোকজনের হাতে মারা পড়ছে। গত দুই মাসে এসব এলাকায় অন্তত ১০ ব্যক্তি মারা গেছে বলেও দাবি করে স্থানীয় রোকজন। তারা জানায়, এ সাপের দংশনে গত দুই মাসে মারা যাওয়া লোকজনের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। তিনি হলেন নিমতলা এলাকার ফারুক হোসেনের স্ত্রী মৌসুমী (২২)। এ ছাড়া এই সাপের দংশনে মারা গেছেন আলীপুর গ্রামের কাওছার আলী (১৮), নিমতলা এলাকার নাইমুর রহমানসহ (৩৫) আরো অন্তত সাতজন।

গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা এলাকার আরেক বাসিন্দা হজরত আলী জানান, রাসেল ভাইপার আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে পদ্মাপারের মানুষদের। দিনের বেলা কেউ পদ্মার চরে যেতে সাহস পাচ্ছে না। আবার রাতে তীরবর্তী এলাকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেও ভয় লাগছে। অনেকে বিছানায় ঘুমাতে যেতেও সাহস পাচ্ছে না।

গোদাগাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইসাহাক আলী বলেন, ‘রাসেল ভাইপার আতঙ্কে কয়েকটি এলাকার মানুষ দিন কাটাচ্ছে। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছে বলে শুনেছি। তবে এসব সাপের কবল থেকে মানুষকে মুক্ত করা যাচ্ছে না। ’


মন্তব্য