kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভবদহে বেশি কষ্ট নারী ও শিশুর

ফখরে আলম, যশোর   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জলাবদ্ধতা ভবদহ এলাকার মানুষের জন্য স্থায়ী দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই অঞ্চলের প্রায় চার লাখ মানুষের ঘর-সংসার কেড়ে নিয়েছে পানি।

তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে নারী ও শিশুরা। পরিবারের সদস্যদের খাবার তৈরির কষ্টকর কাজ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক কাজ—সবখানে বৈরিতার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে নারীকে। আর রোগবালাইয়ের কাছে অসহায় শিশুরা। খাবারের অভাব তো আছেই। শিশুরা সারাক্ষণই থাকছে মায়ের কোলে কোলে। নারী ও শিশুদের অবর্ণনীয় কষ্ট দেখা গেছে ভবদহ এলাকা ঘুরে।

যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ এই ভবদহ অঞ্চল। এখানে আছে প্রায় ৫২টি বিল। গত আগস্ট মাসে দুই দফা ভারি বর্ষণে অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার কয়েক শ গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় চার লাখ মানুষ। এর মধ্যে দুই লাখের বেশি নারী ও শিশু রয়েছে। সরেজমিন মণিরামপুর উপজেলার জলাবদ্ধ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দুর্গত নারী ও শিশুদের যারপরনাই কষ্ট ভোগ করতে দেখা গেছে।

ফজিলা খাতুনের বয়স ৪০ বছর। তাঁর চার ছেলেমেয়ে। স্বামী রুহুল আমিন ভ্যানচালক। বাড়ি ওই উপজেলার আমিনপুর গ্রামে। তাঁর ঘরবাড়ি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ২২ দিন ধরে ফজিলা খতুন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্থানীয় শ্যামকুড় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আশ্রয় নিয়ে আছেন। তিনি বললেন, ‘দুপুরে এক মুঠো চিড়ে খেয়েছি। খাবারের খুব কষ্ট। রান্না করার চুলোও নেই, খড়িও নেই। বাচ্চাদের কষ্ট সহ্য করতে পারি না। ’

রাশিদা খাতুনের বাড়িও একই গ্রামে। তাঁর চার ছেলেমেয়ে। ৯ বছর বয়সের মেয়ে সুমি প্রতিবন্ধী। সারা দিন তাকে কোলে নিয়েই রাশিদা খাতুনকে থাকতে হয়। স্বামী আব্দুল বারী পেশায় দিনমজুর। তাঁদেরও বাড়িঘর কেড়ে নিয়েছে পানি। রাশিদা বললেন, ‘নিজেরা তো খেতে পারছি না। দুটি গরু রয়েছে তাদেরও খেতে দিতে পারছি না। কী করব, কোথায় যাব—জানি না। ’

জলাবদ্ধ জামলা গ্রামে বাড়ি তাসলিমা বেগমের। স্বামী রবিউল ইসলাম কৃষিকাজ করেন। তাঁদেরও বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে শেষ হয়ে গেছে। পাঁচটি গরু বিচালির অভাবে মরতে বসেছে। তাসলিমা বললেন, ‘এক মুঠো বিচালির দাম ১০ টাকা। তাও পাওয়া যায় না। মনে হয় এবার আমার গরুগুলো হাতছাড়া হয়ে যাবে। ’

সকিনা খাতুনের (৬৫) পায়ে দগদগে ঘা। স্বামী আনসার আলী প্রতিবন্ধী। তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। সকিনা বললেন, ‘বাড়িঘর ভেঙে পানির সঙ্গে মিশে গেছে। সকালে চিড়ে খেয়েছি। টয়লেটের খুব কষ্ট। প্রাকৃতিক ডাকের সময় মাথা খারাপ হয়ে যায়। চারদিকে পানি। কোথায় যাব?’

সালেহা বেগমের (৬০) স্বামী মারা গেছেন। তাঁর বাড়িঘর পানির নিচে। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ১৫ দিন ধরে শ্যামকুড় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। সালেহা বললেন, ‘পানিতে পা দিলে পা জ্বলে যায়। দুই পায়ে ঘা। ওষুধ নেই। খাবার পানি নেই। আমরা খিদের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি। আমরা কি বাঁচতে পারব?’

জানা যায়, শ্যামকুড় ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টি পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ১০ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তা, স্কুল ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের এ পর্যন্ত সরকারি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে ১৪ টন চাল, ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ঘর তৈরির জন্য ৩০০ কেজি পলিথিন।

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান এ তথ্য জানিয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, জলাবদ্ধতার কারণে নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ত্রাণের খুব অভাব। শুকনো খাবারসহ ত্রাণ সরবরাহের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার।

 


মন্তব্য