kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অদক্ষতার সঙ্গে পদে পদে গাফিলতি বিসিআইসিতে

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অদক্ষতার সঙ্গে পদে পদে গাফিলতি বিসিআইসিতে

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অডিট বিভাগ পরিচালনা করছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মোসাব্বিরুল ইসলাম। আর পরিচালকের (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) দায়িত্ব পালন করছেন বাণিজ্য বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা লুত্ফর রহমান।

শুধু এ দুজনই নন, বিসিআইসির পরিচালকের (উৎপাদন ও গবেষণা) পদটি মূলত প্রকৌশলীর হলেও দায়িত্ব পালন করেন বাণিজ্য বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করা শাহীন কামাল। একইভাবে জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন) পদে থাকার কথা প্রকৌশল বিষয়ে জানা কারো; কিন্তু এ পদেও আছেন বাণিজ্য বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করা মো. আসাদুর রহমান।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে নিজেই ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানার পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি বিসিআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০১৪ সালের অক্টোবরে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি মাসে একটি করে বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিসিআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে মোহাম্মদ ইকবাল দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হতে চললেও তিনি এ ব্যাপারে কোনো খোঁজ রাখেননি।

বিসিআইসির কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে চট্টগ্রামের ডিএপি সার কারখানার অ্যামোনিয়া গ্যাসের ট্যাংকটি বিস্ফোরিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতি দুই বছর অন্তর কারখানার ওভারহোলিং করার কথা থাকলেও গত ১০ বছরে একবারও তা করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবালের মোবাইল ফোনে গত রবিবার বিকেল ৪টায় একাধিকবার ফোন ও এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। তবে সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে চেয়ারম্যানের অফিশিয়াল মোবাইল ফোন থেকে ফোন দিয়ে মোহাম্মদ ইকবালের ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয়ে একজন বলেন, ‘স্যার বোর্ড মিটিংয়ে আছেন। দুই ঘণ্টা পর তিনি আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। ’

জানা গেছে, চট্টগ্রামের ডিএপি সার কারখানার বিস্ফোরিত অ্যামোনিয়া গ্যাসের ট্যাংকটি নির্মাণ করেছিল চায়না কমপ্লান্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সালে সার কারখানার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর ১০ বছরের মধ্যে গ্যাস ট্যাংকটি বিস্ফোরিত হয় গত ২২ আগস্ট রাতে। ট্যাংকটি নির্মাণের সময় চায়নিজ প্রতিষ্ঠানটি এর আয়ুষ্কাল (মেয়াদ) দিয়েছিল ২৫ বছর। কিন্তু ১০ বছর না যেতেই দুর্ঘটনা ঘটে।

ট্যাংক বিস্ফোরণের কারণ সরেজমিনে দেখতে গত রবিবার চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ডিএপি সার কারখানা পরিদর্শন করে চায়না কমপ্লান্টের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল।

সার কারখানার কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠ’র কাছে অভিযোগ করেন, বিস্ফোরিত অ্যামোনিয়া গ্যাসের ট্যাংকটিতে ব্যবহৃত স্টিল শিটের পুরুত্ব ছিল মাত্র আট মিলিমিটার (এমএম)। কিন্তু ডিএপি সার কারখানার অন্য দুটি ট্যাংকে ব্যবহৃত শিটগুলোর পুরুত্ব ১৮ এমএম। বিস্ফোরিত ট্যাংকে ব্যবহৃত শিটগুলোর পুরুত্ব ১৮ এমএম হওয়ার কথা। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষে (২০০৬ সালে) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ট্যাংকটি কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিভাবে তা মেনে নিলেন—এ বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

এদিকে বিস্ফোরিত অ্যামোনিয়া গ্যাসের ট্যাংকটির সেফটি বাল্ব এবং ফ্লেয়ার পাইপ দুটিই বিকল ছিল বলে জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে উঠে এসেছে। নির্মাণের পর থেকে এই ট্যাংকের সংস্কারকাজ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সার কারখানার কর্মকর্তারা আরো অভিযোগ করেন, বিসিআইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকৌশল জ্ঞান না থাকায় দেশের অধিকাংশ সার কারখানা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, ঘটছে দুর্ঘটনা। নিয়মিত এই কারখানার অডিট হলেও সংস্থার (বিসিআইসি) চিফ অডিট কর্মকর্তার অদক্ষতার কারণে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছে বরাবরই।

ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনাই দায়ী : ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই ডিএপি কারখানার গ্যাস ট্যাংক বিস্ফোরণের মতো বড় দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান। গত রবিবার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। এ সময় উপস্থিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনও এ দুর্ঘটনার পেছনে কারখানার যথেষ্ট ত্রুটি ছিল বলে জানান।

এ সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, অবশ্যই এ দুর্ঘটনার পেছনে কারখানার ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ছিল। পাশাপাশি গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর তা মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতির অভাবও ছিল। এ সময় তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও কাজ করেনি। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে তা নিঃসরণ বন্ধে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে পানি ছিটানো হয়। কিন্তু সে সময় কারখানাটির পানি ছিটানোর ব্যবস্থাপনাও কাজ করেনি। এ জন্য গ্যাস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বাতাসের গতিবেগ পশ্চিমমুখী হওয়ায় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের সৌভাগ্য দুর্ঘটনার সময় বাতাসের গতিবেগ পশ্চিমমুখী ছিল। এ জন্য গ্যাস নদীর দিকে চলে যায়। নয়তো আরো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতো। ’ তিনি এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব কারখানার প্রত্যেক শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে আরো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।

এ দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের ৩০ জন সুদক্ষ কর্মী কাজ করেছেন উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, ‘তারা (৩০ জন) সিঙ্গাপুর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা আমাদের জন্য বড় ধরনের শিক্ষা ছিল। কিন্তু আমাদের কর্মীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে তা মোকাবিলা করেছে। যথেষ্ট দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু গ্যাস থেকে রেহাই পেতে সার কারখানার ফায়ার ফাইটিং দলের সদস্য ও কর্মীরা সবাই আগেই ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। ’

প্রেস বিফ্রিংয়ে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হয়ে গেছে। তদন্ত করে কারখানার যথেষ্ট ত্রুটি পেয়েছি। সংশ্লিষ্টরা দায়িত্বহীনতার পরিচয় না দিলে এমন ঘটনা ঘটত না। আমরা স্থানীয়দের বক্তব্য সংগ্রহ করেছি। সবার সঙ্গে কথা বলে আমরা জড়িতদের চিহ্নিত করেছি। তবে আমরা চাইছি বিসিআইসির টেকনিক্যাল দল তাদের প্রতিবেদন আগে জমা দিক। এরপর সাত কর্মদিবসের মধ্যে আমাদেরটা প্রকাশ করব। ’

উৎপাদন বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতি ১৬ কোটি টাকা : ডিএপি সার কারখানার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার ৬০০ মেট্রিক টন হলেও বর্তমানে উৎপাদন করতে পারে এক হাজার মেট্রিক টন। কর্মকর্তারা জানান, প্রতি টন ডিএপি সার বিক্রি হয় ২৩ হাজার টাকা দরে। সে হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ সার উৎপাদন বন্ধ থাকায় ডিএপি সার কারখানার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৬ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত কারখানার সংস্কারকাজ (ওভারহোলিং) করা হলে এত টাকা গচ্চা দিতে হতো না। এসব দুর্ঘটনা ও আর্থিক ক্ষতি বিসিআইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই হচ্ছে।


মন্তব্য