kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈরিতা

সার্ককেই ঝুঁকিতে ফেলছে পাকিস্তান!

মেহেদী হাসান   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সার্ককেই ঝুঁকিতে ফেলছে পাকিস্তান!

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে পাকিস্তান সরকার। আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বরে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় ওই সম্মেলনকে সামনে রেখে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক করে আসন্ন সম্মেলনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেছে।

তবে পাকিস্তানের এই প্রস্তুতির মধ্যে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে সদস্য দেশগুলো নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে তা নতুন মাত্রা পাওয়ার প্রভাব পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে পড়তে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও টানাপড়েন ও উত্তেজনা আছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকেও সবাই নজর রাখছে। গতকালও দেশটিতে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে।

শুধু আসন্ন সার্ক শীর্ষ সম্মেলন নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বৈরী সম্পর্ক সার্কের স্বপ্নপূরণকেও ব্যাহত করছে নানাভাবে। জানা গেছে, সম্পর্কে টানাপড়েনের প্রভাব আঞ্চলিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও পড়ে। ২০১৪ সালে নেপালে সার্ক সম্মেলনের সময় বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত ওই চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াই ভেস্তে যাচ্ছিল। আটটি সদস্য রাষ্ট্রের সবাই একমত হতে না পারায় মোটরযান চলাচল, আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ চুক্তির সম্ভাবনা আগেই শেষ হয়ে যায়।

২০১৪ সালে নেপালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে নেতারা জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যপূরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। ওই সম্মেলনের দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সার্কের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় সবার সম্মতির ভিত্তিতে। এ ফোরামে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। এ কারণে সম্মিলিতভাবে ইতিবাচক অনেক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বিগত বছরগুলোতে সার্কের মধ্যেই আলাদাভাবে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান মিলে চার দেশীয় সড়ক যোগাযোগের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, ইতিবাচক উদ্যোগেও কোনো সদস্য রাজি না থাকলে সার্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার কাছে অন্যরা জিম্মি হয়ে যায়। চার দেশীয় উদ্যোগগুলো সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তান আগামী নভেম্বর মাসে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের যে তারিখ দিয়েছে তার ব্যাপারে সদস্য অন্য সাত দেশ বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তান প্রাথমিকভাবে সম্মতি দিয়েছে। শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে সাধারণত সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানরা নেতৃত্ব দেন। রীতি অনুযায়ী, কোনো দেশ অংশ না নিতে চাইলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না। আগামী নভেম্বর মাসে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে। তিনি ওই সম্মেলনে অংশ নেবেন—এমনটি ধরে নিয়েই বাংলাদেশ পাকিস্তানে সম্মেলনের তারিখে সম্মতি দিয়েছে।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বৈঠক পাকিস্তান স্থগিত করার প্রভাব সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে পড়বে কি না জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অন্য সব দেশগুলোর মতো পাকিস্তানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও এ অঞ্চলে আরো দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে টানাপড়েন, উত্তেজনা রয়েছে। মাত্রার বিচারে সেগুলো আরো বেশি। তাই অন্যরা কী করছে তাও এখানে বিবেচিত হবে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে পাকিস্তানের অযাচিত মন্তব্য, জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগকে ঘিরে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে বসতে অপারগতা জানিয়েছে। এ জন্য কোনো কারণ না দেখালেও পাকিস্তান ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেওয়ার দিনই বৈঠকের ব্যাপারে অপরাগতা জানায়।

বিগত বছরগুলোতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচার ও রায় কার্যকর করাকে ঘিরে পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বাংলাদেশ নিয়ে নিন্দা প্রস্তাব, হাইকমিশনারকে তলব করার মতো ঘটনাগুলো সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বেশ কবার সতর্ক করেছে। এবার মীর কাসেম আলীর বিষয়ে আদালতের রায় কার্যকরের ব্যাপারেও যদি পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করে তবে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন সৃষ্টি করবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সার্কের ভাবনাই এসেছে বাংলাদেশের কাছ থেকে। সার্কের স্বপ্নপূরণে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে এবারের সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে সব সদস্যকে আমলে নিয়ে সার্ককে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়াও পাকিস্তানের দায়িত্ব। গত মাসে পাকিস্তানে সার্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রসচিব যোগ দেননি। অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীকে পাঠানো হয়েছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী ওই বৈঠকে যোগ দেননি। আবার এ বছর বাংলাদেশে আঞ্চলিক একাধিক বৈঠকে পাকিস্তানের মন্ত্রীরা আসেননি।

জানা গেছে, পাকিস্তানে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে কোনো দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালেও কোনো কোনো দেশ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর বদলে প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে সার্কের গুরুত্ব কমতে পারে। তবে কাশ্মীর ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়লে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকলে সার্কের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।


মন্তব্য